বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০১৫

ভাষা আন্দোলনে কক্সবাজার

রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনকে প্রধানত দুটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথমত ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫১ এবং দ্বিতীয় বা চূড়ান্ত পর্যায় বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কক্সবাজারের অবদান সর্ম্পক তথ্য অপ্রতুল। ঢাকা ও চট্টগ্রাম ও অন্যান্য এলাকার ভাষা আন্দোলনের বিষয়ে যেভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, কক্সবাজার তা থেকে অনেক দূরে এবং সড়ক পথের অনুন্নয়নের কারণে মহকুমা সদরের সাথে প্রত্যেক থানার দ্রুত যোগাযোগ ছিল কষ্টকর। জলপথে দুটি স্টিমার জালালাবাদ (সিনদিয়া কোং) ও ইসলামাবাদ (এ.কে.খান এন্ড কোং) সপ্তাহে দুইদিন টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রাম যেতো। স্থলপথে ইন্দো-বার্মা বাস সিন্ডিকেট ও সেন ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির কয়েকটি বাস কক্সবাজার থেকে দোহাজারী পর্যন্ত যাতায়াত করতো। দেশের খবরাখবর জানার জন্য সংবাদপত্র ওই অঞ্চলে অনিয়মিতভাবে আসতো। ২-৪ দিন পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক আজাদ’ ও ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’ পত্রিকা আসতো। এ সমস্ত পত্রিকার মাধ্যমে দেরিতে হলেও শিক্ষিত লোকজন দেশের খবরাখবর জানার চেষ্টা করতেন।
কক্সবাজারের সাংবাদিকতা জগতে তেমন সচেতন লোক না থাকায় এবং ওই সময়ে সেখান থেকে কোনো পত্রিকা প্রকাশিত না হওয়ায় কিংবা জাতীয়/ আন্তর্জাতিক পত্রিকায় কাজ করা সাংবাদিক সেখানে কর্মরত না থাকায় তেমনভাবে ফলাও করে সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা সমকালীন বৈশ্বিক গণমাধ্যমেও এ সম্পর্কিত তথ্য অনুপস্থিত। তবে বিভিন্ন জনের স্মৃতিকথায় এ সম্পর্কিত যৎকিঞ্চিত তথ্য পাওয়া যায়। এজন্য এ রচনায় প্রধানত নেতৃস্থানীয় ভাষা সংগ্রামীদের সাক্ষাৎকারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ইতিহাস রচনার উৎস হিসেবে সাক্ষাৎকার বা স্মৃতিকথার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অন্যান্য উপাদানের অভাবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নেতৃস্থানীয় ভাষা সংগ্রামীদের সাক্ষাৎকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতিকথা বা সাক্ষাৎকারগুলো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা যেমন তথ্য বিকৃতি, আবেগদৃপ্ত উপস্থাপনা, কথনের অতিরঞ্জন উপস্থাপনা প্রভৃতি ত্রুটির বিষয়ে যথাসম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
মাতৃভাষার সাথে একটি জাতির জাতিসত্তা অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতির কাছে মাতৃভাষা এক মূল্যবান সম্পদ তা আমাদের সকলেরই জানা। ওই অমোঘ সত্য উপলব্ধি করে ষোল শতকের কবি সৈয়দ সুলতান (জন্ম চক্রশালা-পটিয়া) তাঁর ‘ওফাতে রসুল’ গ্রন্থে লিখেন―

‘বঙ্গদেশী সকলের কিরূপে বুঝাইবে
বাখানি আরব ভাষা এ বুঝাইতে নারিব।
যারে যেই ভাষে প্রভূ করিল সৃজন
সেই ভাষে হয় তার অমূল্য ধন।’’

সন্দ্বীপ নিবাসী কবি আবদুল হাকিম (১৬২০-১৬৯০) ‘নুরনামা’ গ্রন্থে ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় লিখেন―
কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস।
সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।।
তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন।
নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।।
আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।
দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।
আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।
যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।
যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ।
সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন।।
সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী।
বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।।
মারফত ভেদে যার নাহিক গমন।
হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ॥
যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুরায়
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।।
মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।
দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।

রামু নিবাসী মধ্যযুগের কবি নসরুল্লাহ খোন্দকার তাঁর ‘মুসার সওয়াল’ গ্রন্থে লিখেন―
বুঝিবারে বাঙ্গালা সে কি ভাবের বাণী
আপনে বুঝন্ত যদি বাঙ্গালের গণ।
ইচ্ছা সুখে কেহ পাপে না দেয়ন্ত মন

অর্থাৎ ধর্ম কথা বাঙ্গালায় বুঝিলে কেহ স্বেচ্ছায় পাপে মন দিবে না।
যুগসন্ধিক্ষণের কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এর সময়কালে ইংরেজি শিক্ষার অভিঘাত দেশের শিক্ষা সংস্কৃতি বিপর্যস্ত হয়, বাঙালির কাছে তখন বাংলা ভাষা ছিলো তাচ্ছিল্য ও ব্যঙ্গের বিষয়। গোঁড়া সংস্কৃতজ্ঞ ও পাশ্চাত্য অনুসারী ইয়ং বেঙ্গল―উভয়ই বাংলা ভাষার অমর্যাদা প্রদর্শন করে। মাতৃভাষার এ অনাদর গুপ্ত কবি সহ্য করতে না পেরে বলে উঠেছেন―

হায় হায় পরিতাপে পূর্ণ দেশ
দেশের ভাষার প্রতি সকলের দ্বেষ।
বৃদ্ধি কর মাতৃভাষা, পুরাও তার আশা
দেশে কর বিদ্যা বিতরণ (স্বদেশ)

মাইকেল মধুসুদন দত্ত ‘বঙ্গভাষা’ কবিতায় লিখেন―
হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন;-
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি।
অনিদ্রায়, নিরাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;-
কেলিনু শৈবালে; ভুলি কমল কানন!
স্বপনে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে
“ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই যারে ফিরি ঘরে!”
পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে
মাতৃভাষা-রূপে খনি, পূর্ণ মণিজালে।

কায়েমী স্বার্থবাদী মহল ও ভাষা সংস্কৃতিতে আক্রমণকারী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভাষা আন্দোলনের মূল আঘাতটি ১৯৫২ সালে হলেও এ আন্দোলন এক দিনে হয়ে উঠেনি। বাঙালির দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল এ আন্দোলন। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৭৭৮ সালে বৃটিশ লেখক ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড বৃটিশ কোম্পানী সরকারের পক্ষে বাঙালিদের ইংরেজি শেখার জন্য A Grammer of the Bengal language’নামক গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তখন ভারতীয় উপমহাদেশের রাষ্ট্রভাষা ছিল ফার্সি। হ্যালহেড তার ব্যাকরণের ভূমিকায় ফার্সির পরিবর্তে বাংলাকে সরকারি কাজ-কর্মে ব্যবহারের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে, কোম্পানী সরকারের সুবিধা হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরতে গিয়ে ফার্সির পরিবর্তে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন। এ যাবৎ পাওয়া ইতিহাস থেকে প্রমাণিত হয় যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব এটাই। তাও একজন বৃটিশ কর্মকর্তা-লেখকের জবানিতে।
প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক বাংলা ভাষার পক্ষে প্রথম উচ্চারণ হয় রাজশাহী থেকে। ‘নুর-আল-ইমান’ পত্রিকার ১ম বর্ষ, ৩য় সংখ্যায় ওই পত্রিকার সম্পাদক মির্জা মোহাম্মদ ইউসুফ আলী ‘বঙ্গীয় মোসলমান ভাই বহিনের খেদমতে নুর-আল-ইমানের আপীল’ নামক সম্পাদকীয়তে উর্দু বাঙালি অনুগতদের ‘খেদমৎগার’ হিসেবে উল্লেখ করে লিখেন―

‘…শরীফ সন্তানেরা এবং তাহাদের খিদমাৎগারগণ উর্দু বলেন, বাঙ্গলা ভাষা ঘৃণা করেন, কিন্তু সেই উর্দু জবানে মনের ভাব প্রকাশ করা তো দূরে থাকুক, পশ্চিমা লোকের গিলিত চর্বিত লিখিত শব্দগুলিও অনেকে যথাস্থানে শুদ্ধ আকারে যথার্থ অর্থে প্রয়োগ করিতেও অপারগ। অথচ বাঙ্গলায় মনের ভাব প্রকাশ করিবার সুবিধা হইলেও ঘৃণা করিয়া তাহা হইতে বিরত হন।… সতেজ স্বাভাবিক বাঙ্গলা ভাষা স্বাধীনতা পাইলে তৎসঙ্গে পল্লীবাসি মোসলমান সমাজের উন্নতির যুগান্তর উপস্থিত হইবে। …বঙ্গের মোসলমান ভ্রাতাভগ্নিগণ!…. বাঙ্গলা ভাষাকে হিন্দুর ভাষা বলিয়া ঘৃণা না করিয়া আপনাদের অবস্থা ও সময়ের উপযোগী করিয়া লউন। ১
১৯০৬ সালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিমলীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে, সে অধিবেশনেও রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি ওঠে। ১৯০৭ সালে বিপ্লবী আবদুর রসুল ও আবদুল হালিম গজনবীর উদ্যোগে একটি কোম্পানী লিমিটেড কর্তৃক প্রকাশিত ‘দি মুসলমান’ পত্রিকার সম্পাদক মজিবর রহমান উর্দুভাষী বাঙালিদেরকে ঘৃণা করে ‘দি মুসলমান’ পত্রিকায় কলম ধরেছেন। এ সম্পর্কে সত্যেন সেন (১৯০৭-১৯৮১) ‘বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’ নামক গ্রন্থে লেখেন―
“শিক্ষিত মসুলমান একটি চিন্তাধারা লক্ষ করা যেত তাদের মধ্যে অনেকেই উৎপত্তি ও সংস্কৃতির দিক দিয়ে নিজেদের বাঙালি পরিচয় বলে স্বীকার করতে চাইতনা এবং বাংলা ভাষী হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে নিজেদের ভাষা বলে দাবি করতেন। ‘দি মসুলমান’ পত্রিকা সব সময় এই লজ্জাকর মনোবৃত্তির উপর তীব্র কষাঘাত করে এসেছে২ ।”
মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের দাবিটি সম্ভবত প্রথম তুলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। ১৯১৮ সালে ভাষা বিতর্ক চলাকালে ‘আল ইসলাম’ পত্রিকার আশ্বিন ১৩২৫ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য বনাম বঙ্গীয় মুসলমান’ নামক প্রবন্ধে লিখেন―
‘মাতৃভাষাকে জাতীয় ভাষার স্থলে বরণ করা ব্যতিত কোনো জাতি কখনো উন্নতির সোপানে আরোহণ করতে পারে না।’
এ দিকে বৃটিশ ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলন ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকলে নতুন করে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গান্ধী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে চিঠি লিখে জানতে চান, ভারতবর্ষ স্বাধীন হলে তার সাধারণ ভাষা কী হতে পারে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের সাধারণ ভাষা হিসেবে হিন্দীর পক্ষে অভিমত দেন এভাবে The only possible national language for intercourse is Hindi in India।’3 |
বাংলার বাইরে অন্যান্য প্রদেশের মুসলমানদের রায় ছিল উর্দুর পক্ষে। অপরদিকে বাঙালি মুসলমানদের মধ্য থেকে বাংলার পক্ষে আওয়াজ ওঠে। ১৯১৮ সালে রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে আলোচনার জন্য শান্তি নিকেতনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেন। সারা ভারত থেকে আগত ভাষাতত্ত্ববিদদের সামনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ একটি প্রবন্ধ পাঠ করে ভারতবর্ষের সাধারণ ভাষার হওয়ার যোগ্যতা রাখে বাংলা, হিন্দী ও উর্দুর কথা উল্লেখপূর্বক সাধারণ ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে শুধু ভারত কেন, সমগ্র এশিয়া মহাদেশেই বাংলা ভাষার স্থান হবে সর্বোচ্চ এবং ভাব সম্পদ ও সাহিত্যগুণে বাংলা ভাষা এশিয়া ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে অদ্বিতীয় বলে উল্লেখ করেন। ড. শহীদুল্লাহর সূক্ষ্মদর্শী প্রস্তাবনা সত্ত্বেও অনাগত স্বাধীন ভারতবর্ষে রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক প্রধানত হিন্দী ও উর্দুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। হিন্দুরা হিন্দীর পক্ষে, মুসলমানরা উর্দুর পক্ষে। তবে এ হিন্দী ও উর্দু বিতর্কের ডামাডোলের মধ্যে বাঙালি মুসলমানদের চিন্তাধারা বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সবসময় এক বিশেষ স্থান লাভ করে।
অবশ্য পূর্ব থেকে শুরু হয় মুসলমান ও হিন্দু বিতর্ক। এ বির্তকের ডামাডোলে শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক নতুন বিতর্ক। এ সময় বাঙালি মুসলমানের জাতিসত্তার প্রয়োজনে মাতৃভাষা বাংলার গুরুত্ব এবং সে ক্ষেত্রে বাংলার পরিবর্তে অন্য কোনো ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ সাতাশি বছর আগে স্পষ্ট ভাষায় হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছিলেন―

‘বাংলাদেশের শতকরা নিরানব্বইয়েরও অধিকসংখ্যক মুসলমানের ভাষা বাংলা। সেই ভাষাটাকে কোণঠাসা করিয়া তাহাদের উপর যদি উর্দু চাপানো হয় তাহা হইলে তাহাদের আধখানা কাটিয়া দেওয়ার মতো হইবে না কী? চীন দেশের মুসলমানের সংখ্যা অল্প নহে, সেখানে কেহ বলে না যে চীনা ভাষা ত্যাগ করিলে তাহাদের মুসলমানির খর্বতা ঘটিবে।’
বাংলা-উর্দু ঘিরে বাঙালি মুসলমানের ভাষা সমস্যার বিষয়টি একটু ভিন্নভাবে হলেও দীর্ঘদিন ধরে উপস্থিত এবং রবীন্দ্রনাথ সঙ্গত কারণেই এ সম্পর্কে তার সুচিন্তিত মতামত দেন।
১৯২১ সালের খেলাফত আন্দোলনের সময় সারা ভারতের নেতৃস্থানীয় চার ভাগের তিন ভাগ মুসলমানগণ ভারতের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার জন্য যখন বৃটিশ সরকারকে চাপ দিচ্ছিল, তখন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী লিখিতভাবে বৃটিশ সরকারকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে বলেন―‘ভারতের রাষ্ট্রভাষা যা-ই হোক না কেন বাংলার রাষ্ট্রভাষা করতে হবে বাংলাকে।’৪ বাংলা ভাষী শিক্ষার্থীদেরকে উর্দুর মাধ্যমে মাদ্রাসা শিক্ষাদানের প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে ‘সওগাত’ প্রতিবাদ জানায় ১৯২৬ সালে।
বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য সাধনার পথে বিরাজমান প্রথম বাধা সম্পর্কে বাংলার বিবেক আবুল ফজল চিহ্নিত করেছিলেন বাংলা ভাষার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞামূলক মনোভাব। বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করে উর্দু ভাষাকে নিজের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার যে উৎকট মানসিকতা তিনি এক শ্রেণির বাঙালি মুসলমানের মধ্যে লক্ষ করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হন সেই ১৯২৬ সালে, ‘মাতৃভাষা ও বাঙালি মুসলমান’ শীর্ষক প্রবন্ধে। তাঁর শ্লেষাত্মক ভাষায় সাহসী উচ্চারণ করতে দেখা যায় এই প্রবন্ধে―

বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কী? উর্দু না বাংলা? আমার মতে ইহাই সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত কথা। আমগাছে আম ফলিবে না কাঁঠাল-এমন অদ্ভুত প্রশ্ন অন্য কোনো দেশে কেহ করিয়াছেন কিনা জানি না। (তরুণপত্র, শ্রাবণ ১৩৩২)
১৩২৬ বঙ্গাব্দের শুরুতে চট্টগ্রামে মুসলমান ছাত্র সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জাতীয়তা প্রসঙ্গে বলেন―
‘তোমরা কেবল ছাত্র নও, তোমরা বাঙালি। তোমরা বাঙালি মুসলমান। এ ক্ষেত্রে ধর্মকে স্বীকার করে নিয়েই বাঙালি জাতীয়তা স্বীকৃতি পায়।’
এ প্রসঙ্গে নুরুন্নেছা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনী বলেন―
পুরুষানুক্রমে বাঙলাদেশের গ-ীর মধ্যে বাস করে আর বাঙ্গালা ভাষাতে সর্বক্ষণ মনের ভাব ব্যক্ত করেও যদি বাঙালি না হয়ে আমরা অপর কোনো একটা জাতি সেজে বেঁচে থাকতে চাই, তাহলে আমাদেরত আর কোনো উত্থান নাই-ই, অধিকন্তু চিরতমসাচ্ছন্ন গহ্বর মধ্যে পতন অবশ্যম্ভাবী। (‘সওগাত’ ৭ম, ১ম সংখ্যা (১৩৩৬)।
সাহিত্য সংস্কৃতির অঙ্গনে উর্দু-বাংলা বিতর্কের সময় একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি বাংলার পক্ষে কলম ধরেছেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মোজাফ্ফর আহমদও এতে অংশ নিয়েছেন। আল-এসলাম, ৩য় বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, শ্রাবণ ১৩২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘উর্দু ভাষা ও বঙ্গীয় মুসলমান’ প্রবন্ধে তিনি উর্দুভাষীর দালালদের তিরস্কার করে বলেন―
যাহারা প্রকৃতই উর্দ্দুভাষী তাহারা বাংলা দেশে উর্দ্দু চালাইতে চান কোন্ সাহসে? কলিকাতার খিছুড়ি মোসলমানগুলিকে দেখিয়াই তাহারা মনে করেন যে, বাংলা দেশের মোসলেমগণের মাতৃভাষার কোনো ঠিকানা নাই? এটাই তাঁহাদের বিষম ভুল। কলিকাতা বাংলাদেশ বটে, কিন্তু বাংলা দেশটা কলিকাতা নহে। ..যখন উর্দ্দু ভাষা জন্ম গ্রহণ পর্যন্ত করে নাই তখনো বাঙ্গালী মোসলমানগণের মাতৃভাষা বাংলা ছিল। বাঙ্গালী মোসলমান কবি যখন ‘পদ্মাবতী’ কাব্য রচনা করিয়াছিলেন, তখন উর্দ্দুভাষা যে ভারতের কোনো দেশের বাজারে আবদ্ধ ছিল তাহা নির্ণয় করা সুকঠিন।… কোনো গুণে উর্দ্দু আমাদের বরেণ্য? ভারতের অর্ধেকের বেশি মোসলমান কথা বলেন বাংলায়, আর অবশিষ্ট বলেন বিভিন্ন ভাষায়। তথাপি বাঙ্গালী মোসলমানকে উর্দ্দু ধরিতে হইবে, আচ্ছা জবরদস্তি বটে। বাজারে-শিবিরের ভাষা উদ্দুর্, বাজারে-শিবিরে চলুক। একটা জাতিকে জোর করিয়া উর্দ্দু শিখাইবার কী প্রয়োজন? আর উর্দ্দুর দেশের কোনো জায়গায় এত এসলামী ভাবের দান ডাকিয়াছে যে বাঙ্গালী মোসলমানদিগকেও উর্দ্দু গ্রহণ করিতে হইবে?…ফল কথা, বাংলাদেশে আমরা উর্দ্দুকে কখনো প্রশ্রয় দিতে পারি না। সখ করিয়া যিনি শিখতে চান শিখুন, কিন্তু উর্দ্দু এদেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা নহে। (মোজাফ্ফর আহমদ, আল-এসলাম, ৩য় বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, শ্রাবণ ১৩২৪ সংখ্যা)
অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত সাংবাদিক সাহিত্যিক মোহাম্মদ আবদুর রশিদ সিদ্দিকী (১৮৯৪-১৯৫১) তার ‘চট্টগ্রামী-ভাষাতত্ত্ব’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেন―
‘পৃথিবীর কোনও ভাষাকে ভাষার পর্য্যায় হইতে বাদ দিবার অধিকার কাহারো নাই।
…. যেই বুলিতে কাঁদিতে কাঁদিতে মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ট হইয়াছি, সেই ভাষার হাসি কান্নার ভিতর দিয়া নিজেদের উৎকর্ষ গঠন করিয়া থাকি এবং যেই বুলির মধ্যদিয়া হা হতাশময় কাতরোক্তি করিতে করিতে চির বিদায়ের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া থাকি, সেই মাতৃবুলির এটতা অবজ্ঞা এবং এক প্রকার গ্লানী আমরা কোন্ ন্যায়শাস্ত্রের দোহাই দিয়া নীরবে জীর্ণ করিয়া যাই?

‘ইসলাম প্রচারক’ এর ৮ম বর্ষ, ১১শ সংখ্যায় ‘মুসলমান সম্প্রদায় ও তাহার পতন’ প্রবন্ধে আবদুল হক চৌধুরী বলেন―
‘আমরা বাঙ্গালী, আমাদের মাতৃভাষা বাঙ্গালা বলিয়াই সকলে স্বীকার করে যদিও নগরবাসী মুষ্টিমেয় মোসলমান উর্দু ভাষা বলিয়া থাকেন।…আমরা এখন এই দেশের লোক বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। …সুতরাং বঙ্গভূমিতে বাস করিতে হইলে বাঙ্গালা ভাষা শিক্ষা করা নিতান্ত দরকার। দুঃখের বিষয়, ৫০০ বৎসর যাবৎ আমরা এই দেশে বাস করিতেছি, কিন্তু এ যাবৎ বাঙ্গালা ভাষায় মুসলমান সুলেখকের আবির্ভাব হয় নাই। …বাঙ্গালা আদালতের ভাষা, অর্থকরী ভাষা, কার্যকরী ভাষা, দেশের ভাষা। আমি বলি, বাঙ্গালা ভাষা মাতৃভাষা বলিয়া স্বীকার করিলে দোষ কী?
‘বঙ্গীয় মোসলমান ও উর্দ্দু সমস্যা’ প্রবন্ধে মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী বলেন―
‘বাঙ্গালাকে ছাড়িয়া বা বাঙ্গালার পরিবর্ত্তে উর্দ্দু শিক্ষা করা হউক ইহার আমরা আদৌ সমর্থক নহি, এবং তাহা সম্ভবপর বলিয়াও স্বীকার করি না। বাঙ্গালা বঙ্গদেশের মাতৃভাষা, এই ভাষা ত্যাগ করিবার কোনো উপায় নাই।’
মোয়াজ্জিন, ২য় বর্ষ, ৯ম-১০ম সংখ্যা; আষাঢ় ১৩৩৭ সংখ্যায় ‘বাংলা ভাষা ও মুসলমান’ প্রবন্ধে আবুদল মজিদ বিএ লিখেন―
‘বহু শতাব্দী যাবৎ বাংলার ক্রোড়ে লালিত পালিত হইয়া এবং যুগ-যুগান্তর যাবৎ মাতার মুখে বাংলা শুনিয়াও বঙ্গীয় মুসলমান বাংলা ভাষাকে আদর করিতে শিখে নাই। দেশটির ন্যায় ভাষাটার প্রতিও তাহাদের যেন পরদেশী ভাব। এই বিংশ শতাব্দীতে এমন অনেক অভিজাত্যাভিমানী মহাত্মা আছেন যাহাদের মতে বাংলাকে মাতৃভাষা বলিলে শরাফতের হানি হয়। আমাদের ভাবের আদান প্রদান ও চিন্তাশক্তি আরবী, পারসি ও উর্দুতে প্রকাশ করিবার বৃথা চেষ্টাই মাতৃভাষা ও সাহিত্যে আমাদের দাবি ও মর্যাদা রক্ষার সুযোগকে প্রথম হইতেই আমরা উপেক্ষা করিয়া আসিয়াছি।’
বাংলার মুসলমানগণ আরব, পারস্য, আফগানিস্তান অথবা তাতারের অধিবাসীই হউন না কেন বাঙালি হিসেবে আমাদের ভাষা বাংলা’ উল্লেখ করে বাসনা, ২য় ভাগ, ১ম সংখ্যা; বৈশাখ ১৩১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘উত্তর বঙ্গের মুসলমান সাহিত্য’ প্রবন্ধে হামেদ আলী বলেন―
‘আমাদের পূর্ব্বপুরুষগণ আরব, পারস্য, আফগানিস্তান অথবা তাতারের অধিবাসীই হউন, আর এতদ্দেশবাসী হিন্দুই হউন, আমরা এক্ষণে বাঙ্গালী; আমাদের মাতৃভাষা বাঙ্গালা। বাস্তবিক পক্ষে যাহারা ঐ সকল দেশ হইতে এতদ্দেশে আগমন করিয়াছিলেন, তাহারাও এক্ষণে আরব, পারসি অথবা আফগান জাতি বলিয়া আত্মপরিচয় দিতে পারেন না, …মাতৃগর্ভ হইতে ভূমিষ্ট হইয়া প্রথম যে ভাষা আমাদের কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইয়াছে, যে ভাষা আমরা আজীবন ব্যবহার করি, যে ভাষায় আমরা সুখ দুঃখ, হর্ষ বিষাদ প্রকাশ করি, যে ভাষায় হাটে বাজারে, ব্যবসায় বাণিজ্যে এবং বৈষয়িক কার্য্যে কথোপকথন করি; যে ভাষায় নিদ্রাকালে স্বপ্ন দেখি; সেই ভাষা বাঙ্গালা। সুতরাং বাঙ্গালা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা; ….আমাদের অনেকেরে মোহ ছুটে নাই। তাহারা বাঙ্গালার বাঁশবন ও আম্র কাননের মধ্যস্থিত পর্ণ কুটিরে নিদ্রা যাইয়া এখনো বোগদাদ, বোখরা, কাবুল, কান্দাহারের স্বপ্ন দেখিয়া থাকেন। কেহ কেহ আবার বাঙ্গালার পরিবর্ত্তে উর্দুকে মাতৃভাষা করিবার মোহে বিভোর। দুর্বল ব্যক্তিরা যেমন অলৌকিক স্বপ্ন দর্শন করে, অধঃপতিত জাতিও তেমনি অস্বাভাবিক খেয়াল আঁটিয়া থাকে।
ভাষাকে মুসলমানী করার ব্যর্থ চেষ্টা না করে বঙ্গভাষার ভাবের ঘরে মুসলমানীর প্রাণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে ‘কোহিনুর’ এর মাঘ ১৩২২ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বাঙ্গালী মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য’ প্রবন্ধে মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী বলেন―
‘বাঙ্গালী মুসলমানের মাতৃভাষা বাঙ্গালা, ইহা দিনের আলোর মতো সত্য। ভারতব্যাপী জাতীয় সৃষ্টির অনুরোধে বঙ্গদেশে উর্দ্দু চালাইবার প্রয়োজন যতই অভিপ্রেত হউক না কেন, সে চেষ্টা আকাশে ঘর বাঁধিবার ন্যায় নিষ্ফল। বাঙ্গালা ভাষায় জ্ঞানহীন মৌলভী সাহেবগণের বিদ্যা ও বঙ্গদেশে উর্দ্দু শিক্ষার বিফলতা তাহার জলন্ত প্রমাণ। সুতরাং জনসমাজেহ উর্দ্দু শিক্ষা হইতে নিষ্কৃতি দিলে নিশ্চয়ই জাতীয়তা বৃদ্ধির অনিষ্ট হইবে না। …ভাষাকে মুসলমানি করিবার চেষ্টায় শক্তিক্ষয় না করিয়া বঙ্গভাষার ভাবের ঘরে মুসলমানীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা লক্ষ গুণে প্রয়োজন।’
এ প্রসঙ্গে সৈয়দ এমদাদ আলী বলেন―
‘কেহ উর্দুর স্বপ্নে বিভোর হইলেও বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা যে বাঙালা এ বিষয়ে কোনো মতদ্বৈত থাকা উচিত নয়। ’(বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, ১ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা. ১৩২৫)।’
সবকিছু ত্যাগ স্বীকার করতে পারলেও ভাষা ত্যাগ করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়ে মোহাম্মদ লুৎফর রহমান ‘বঙ্গীয়-মসুলমান-সাহিত্য পত্রিকা’ ৪র্থ বর্ষ, ১ম সংখ্যা; বৈশাখ ১৩২৮ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘উর্দু ও বাঙ্গলা সাহিত্য’ প্রবন্ধে লিখেন―
‘আমি ভিখারী হইতে পারি, দুঃখ অশ্রুর কঠিনভারে চূর্ণ হইতে আপত্তি নাই। আমি মাতৃহারা অনাথ বালক হইতে পারি―কিন্তু আমার শেষ সম্বল-ভাষাকে ত্যাগ করিতে পারি না। আমার ভাষা চুরি করিয়া আমার সর্বস্ব হরণ করিও না। মাতৃভাষাকে কেমন করিয়া ভুলিব? এমন অসম্ভব প্রস্তাব করিয়া আমার জীবনকে অসাড় ও শক্তিহীন করিয়া দিতে চায়- কে? বিদেশী ভাষায় কাঁদিবার জন্য―কে আমাকে উপদেশ দেয়?..
গৃহের পার্শ্বে উর্দুর কলহাসি আমরা নিত্যই শুনি, কিন্তু তাহাতে বাঙ্গালী মোসলমানের হৃদতন্ত্রীতে জাগে না। সে তাহাতে যথার্থ আনন্দ ও শান্তি লাভ করে না।’

মাতৃভাষার প্রতি ঘৃণা করাকে লজ্জাজনক উল্লেখ করে খাদেমাল এসলাম বঙ্গবাসী ‘বাঙালির মাতৃভাষা’ প্রবন্ধে বলেন―
‘মাতৃভাষার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা, বাঙ্গালী হইয়া নিজেদের মাতৃভাষা উর্দু বা আরবী বলিয়া পরিচয় দেওয়া কিংবা বাঙ্গলা জানি না ভুলিয়া গিয়াছি, এরূপ বলা―এই মারাত্মক রোগ কেবল এক শ্রেণির মুসলমানের মধ্যে দেখা যায়। তাহাদের এরূপ নীতি অবলম্বন করা কি বাস্তবিক পক্ষে নিতান্ত লজ্জাজনক নহে? যাহারা এরূপ আচরণ করে তাহারা যে আপন মাতা ও মাতৃভূমির প্রতি নিন্দা প্রকাশ করে এবং নিজমুখে নিজের মায়ের এবং দেশের দীনতা জ্ঞাপন করে, তাহাতে কিছুমাত্র সংশয় নাই।’
ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজের মাতৃভাষাকে অস্বীকার করাকে নিজের মা-কে অস্বীকার করার নামান্তর উল্লেখ করে ‘সাহিত্যিক, ১ম বর্ষ, ১১শ সংখ্যা; আশ্বিন ১৩৩৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বাঙ্গলা সাহিত্য ও মুসলমান’ প্রবন্ধে মোহাম্মদ গোলাম মাওলা বলেন―
বাঙ্গলার পরিবর্ত্তে আরবী ও উর্দ্দু শব্দ ব্যবহার করার সঙ্গে যেন জাতীয়তা বা ধার্মিকতার একটা অন্ধ মনোভাব সংশ্লিষ্ট রহিয়াছে। …বাঙ্গলা ভাষার প্রতি একটা হৃদয় নিহিত স্বাভাবিক মমতা যেন আমাদের নেই, আরবী, ফার্সি বা উর্দ্দুই যেন তদপেক্ষা আমাদের চেয়ে বেশি আপন। নিজের মাতৃভাষার প্রতি এই যে একটা অজ্ঞাত অশ্রদ্ধা ও তাচ্ছিল্যের ভাব এবং অন্যভাষার প্রতি একটা প্রচ্ছন্ন দরদ ইহাকে আমি বড় অশ্রদ্ধা করি। …আরবী আমাদের ধর্মভাষা, আল্লাহর বাণী উহাতে নাজিল হইয়াছে, রসুলের সুন্নত ও হাদিস উহাতে, তাই উহা আমাদের প্রিয়, ফার্সি ও উর্দুতে ইসলামের আলেমগণ অসাধ্য সাধন করিয়া রাখিয়া গিয়াছেন, তাই উহাদিগকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু উহাদিগকে ভালবাসিব বলিয়া নিজের মাতৃভাষাকে অপমান করিব…ইহা কোন ন্যায়ের অন্তর্গত! …ধর্মের গোঁড়ামি একবার আমাদিগকে শিক্ষাক্ষেত্রে অর্ধ শতাব্দী পিছাইয়া ফেলিয়া দিয়াছে, আবার যেন মুসলমানী বাঙ্গলার মোহ আমাদিগকে পথ না ভুলায়।’
১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের সভাপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে দলের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রবর্তনের উদ্যোগ নিলে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে বাঙালি প্রতিনিধিদের বিরোধিতায় সে উদ্যোগ সফল হয়নি। মাতৃভাষাকে সকল পর্যায়ের শিক্ষার মাধ্যমরূপে গ্রহণ করার জন্য শিখা গোষ্ঠীও সংগঠিত আন্দোলন চালায় এ সময় থেকেই। এক রাষ্ট্রভাষার নির্বাচন নিয়ে হিন্দু উর্দুর সমর্থকদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ অন্যদিকে রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ। এ দুটি দিক বিবেচনা করে ১৯৩৭ সালের ২৩ এপ্রিল আজাদ একটি দারুণ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। পত্রিকার ভাষায়―
সাহিত্যের দিক দিয়ে বাংলা ভাষা ভারতের সমস্ত প্রাদেশিক সাহিত্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাংলা ভাষায় বিবিধ ভাব প্রকাশোপযোগী শব্দের সংখ্যাও বেশি। অতএব, বাংলা সবদিক দিয়েই ভারতের রাষ্ট্রভাষা হবার দাবি করতে পারে।….রাষ্ট্রভাষার নির্বাচন লয়ে হিন্দী-উর্দুর সমর্থকদের মধ্যে আজ যে তুমুল সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ উপস্থিত হয়েছে, তার ফলে হয়তো উর্দু ও হিন্দীর মধ্যে কোনোটারই রাষ্ট্রভাষার আপন অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভবপর হবেনা। কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা হলে এ সাম্প্রদায়িক সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা বহু পরিমাণ কমে যেতে পারে।
১৩৪৫ বাংলা সনে ভারতে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ সম্পর্কে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ভারতের রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে ‘বিদ্বজ্জনের আলোচনা’ শিরোনামে এক সংবাদ ও আলোচনায় বলা হয়―
‘সম্প্রতি রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে আলোচনা করার নিমিত্তে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ভবনে একটি সভার অধিবেশন হয়। সুপ-িত হীরেন্দ্রনাথ দত্ত মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন। তিনি এবং অতুল চন্দ্রগুপ্ত, অর্ধেন্দু কুমার গঙ্গোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীতি কমার চট্টোপাধ্যায়, খগেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রফুল্ল কুমার সরকার, সুন্দরী মোহন দাস ও দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। ‘বাংলার বহুলতার জন্য লিখিত ও অন্যান্য উপায় অবলম্বন করা উচিত: বিশেষ প্রয়োজন ভিন্ন বাঙালি মাত্রেরই দৈনন্দিন কার্য ও ব্যবহারে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা কর্তব্য, বাংলাদেশ প্রবাসী অন্য ভাষাভাষী ব্যক্তিদের সহিত যতদূর সম্ভব বাংলা ভাষায় কথোপকথন ও চিন্তার বিনিময় কর্তব্য, এই সভার মতে ভারতীয় রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থায় রাষ্ট্রীয় ভাষা নির্ধারণের চেষ্টা কালোচিত নহে ও অসমীচীন। ভারতবর্ষে পূর্ণ স্বরাজ প্রতিষ্ঠিত হইবার পর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তভূক্ত প্রদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিবর্গ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ভাষা নির্দিষ্ট হওয়া উচিত মর্মে আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়। ওই সভায় ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সম্ভাবনা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, ‘সাহিত্যের গৌরব থাকিলেই ভাষার প্রসার হয় না।’ ব্যস, এখানেই সমাপ্তি ঘটে ভারতের রাষ্ট্রভাষা সম্বন্ধে বিদ্বজ্জনের আলোচনা ’

ইতোমধ্যে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শুরু হয় পাকিস্তান আন্দোলন। এ আন্দোলনের সময় আবার উঠে আসে রাষ্ট্রভাষা বাঙলার প্রশ্নটি। ইতোমধ্যে অনেক লেখকরা লিখেন পাকিস্তান নিয়ে বিভিন্ন রকমের বই। ওই সব লেখকদের মধ্যে কতিপয় লেখক উর্দু ভাষার পক্ষে লিখলেও কয়েকজন লেখক বাংলা ভাষার পক্ষেই লেখেন। তার মধ্যে অন্যতম মুজীবর রহমান খাঁ। মুজীবর রহমান খাঁ তার রচিত ‘পাকিস্তান’ গ্রন্থে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, ‘মুসলিম লীগ এতদিন উর্দুকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা বলিয়া প্রচার করিয়াছে সত্য। কিন্তু যতদিন লীগ অখ- ভারতে বিশ্বাসী ছিল, ততদিন তার এ দাবির জোর ছিল। লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা ভিন্ন আর কিছুই হতে পারেনা। (পাকিস্তান, মুজীবর রহমান খাঁ, পৃ: ১৭২)। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘ভারতে উর্দুুর সাথে একমাত্র বাংলা সমমর্যাদা দাবি করিতে পারে। এই উভয় ভাষা যেমন শব্দ সম্পদে উন্নত, তেমনই উভয় সাহিত্যও বিশ্বের বড় বড় সাহিত্যের পার্শ্বে স্থান লাভের যোগ্য। সুতরাং নির্ভয়ে বলা যাইতে পারে, পূর্ব পাকিস্তানে যেমন বাংলা, হিন্দুস্থানে যেমন হিন্দী তেমনই পশ্চিমা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা হইবে উর্দু।৫ মুজীবর রহমান খাঁর মতো একই ধরনের মতামত প্রকাশ করেন হাবিবুল্লাহ বাহার তাঁর ‘পাকিস্তান’, তালেবুর রহমানের ‘পাকিস্তানবাদের ক্রমবিকাশ’ ও ‘সর্বহারাদের পাকিস্তান’ গ্রন্থে এবং অধ্যাপক আবুল মনসুর আহমদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি ফররুখ আহমদ, ড. ফেরদৌস খান প্রমুখ তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছর আগে ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক আবুল হাশিম কর্তৃক প্রাদেশিক কাউন্সিলের নিকট পেশকৃত খসড়া ম্যানিফেস্টোতে বাংলাকে পূর্ব বাংলার রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করা হয়।
১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন এর নেতৃত্বে মাউনব্যাটেন পরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই আবুল মনসুর আহমদ দৈনিক মিল্লাত এর সম্পাকদীয় কলামে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা ভাষাই হবে, বলাইবাহুল্য বলে অভিমত প্রকাশ করেন। একই মাসের ৩০ জুন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন। এর কয়েকদিন পরই যখন রাষ্ট্রভাষা নিয়ে দিন দিন জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে ঠিক তখনি মো. তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দিন আহমদ, ও কমরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় গণ আজাদী লীগ। এই দলের ম্যানিফেস্টোতে বলা হয়―‘বাংলা হইবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’।
মাসিক মোহাম্মদীতে ১৩৫০, কার্তিক সংখ্যায় আবুল মনসুর আহমদ ‘পূর্ব পাকিস্তানের জবান’ শীর্ষক প্রবন্ধে রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করে বলেন―
‘উর্দু নিয়ে এই ধস্তাধস্তি না করে আমরা সোজাসুজি বাংলাকে যদি পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষারূপে গ্রহণ করি, তবে পাকিস্তান প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমরা মুসলিম বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায় নিজেরাই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও শিল্পগত রূপায়ণে হাত দিতে পারবো।’

কিন্তু সংখ্যায় কম হলেও ভিন্ন মতাবলম্বীদের অভাব ছিলো না এ পূর্ব বাংলায়। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে বর্তমান ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের অন্তর্গত হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত এক উর্দু সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং পরে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর চৌধুরী খালিকুজ্জামান (১৮৮৯-১৯৬০) ঘোষণা করেন যে,‘উর্দু হবে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা।’ বিভাগ পূর্বকালে ১৯৪৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন এক শ্রেণির শিক্ষিত ব্যক্তির রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিপক্ষে বক্তব্য রাখার কঠোর সমালোচনা করে ‘পাকিস্তান: রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য ’ শীর্ষক প্রবন্ধে কবি ফররুখ আহমদ বলেন―
পাকিস্তানের অন্তত: রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে এ কথা সর্ববাদীসম্মত হলেও আমাদের এই পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকজন তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তি বাংলা ভাষার বিপক্ষে এমন অর্বাচীন মত প্রকাশ করেছেন, যা নিতান্ত লজ্জাজনক। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় রূপায়িত করলে ইসলামী ঐতিহ্যের সর্বনাশ হবে এই তাদের অভিমত। কী কুৎসিত পরাজয়ী মনোবৃত্তি এর পেছনে কাজ করছে―এ কথা ভেবে আমি বিস্মিত হয়েছি। যে মনোবৃত্তির ফলে প্রায় ২০০ বছর বাঙলা ভাষায় ইসলামের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ ছিল সেই অন্ধ মনোবৃত্তি নিয়েই আবার আমরা ইসলামকে গলাটিপে মারার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছি। (মাসিক সওগাত, আশ্বিন সংখ্যা, ১৩৫৪)।
চৌধুরী খালিকুজ্জামানের উর্দুর পক্ষে দালালির এক মাস ছয় দিন পর অর্থাৎ ২২ জুন কলকাতার ইত্তেহাদ পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব ’ শিরোনামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধে বামপন্থী লেখক-সাংবাদিক আবদুল হক বাংলার ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে লেখকের গুরুত্বপূর্ণ মতামত দেন। ৩০ জুন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ’ প্রবন্ধে বাঙলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন―
যে স্বাধীনতা আসছে, ভাষাগত স্বাধীনতা না পেলে তা হবে আংশিক এবং বদ্ধমুখ স্বাধীনতা। অতএব, পাকিস্তানের―কেবল পূর্ব পাকিস্তানের নয়, পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় পাকিস্তানকে নিয়ে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হবার যোগ্যতা সবচেয়ে বেশী বাংলা ভাষার।’

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক মাসে আগে (জুলাই মাসে) আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ অভিমত ব্যক্ত করেন, হিন্দীকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর যুঙ্গিসংগত কারণে উদর্ুূকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা উচিত। ড. জিয়াউদ্দিন আহমদের বক্তব্য খ-ন করে ২৯ জুলাই দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ নামক প্রবন্ধ লিখে জোরালো প্রতিবাদ করে রাষ্ট্রভাষারূপে বাংলার দাবি তুলে ধরেন। তিনি বলেন―
‘কংগ্রেসের নির্দিষ্ট হিন্দীর অনুকরণে উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষারূপে গণ্য হইলে তাহা শুধু পশ্চাদগমনই হইবে। …যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজি ভাষা পরিত্যক্ত হয়, তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোনো যুক্তি নাই। …পূর্ব পাকিস্তানের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার পরিবর্তে উর্দু বা হিন্দীকে গ্রহণ করা হইলে ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতার নামান্তর হইবে। ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ের শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দু ভাষার পক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করেছেন, আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এটা বৈজ্ঞানিক শিক্ষানীতির বিরোধীই নয়, বরং প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের নীতি বিহর্গিতও বটে। (সূত্র: দৈনিক আজাদ, ২৯ জুলাই ১৯৪৭)
৩০ জুলাই ১৯৪৭ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’ নামক প্রবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত প্রকাশ করেন মাহবুব জামাল জাহেদী।৬ উর্দুকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা করার উদ্ভট স্বপ্নকে আলাদিনের বিচিত্র প্রদীপ অপেক্ষা বিস্ময়াবহ বলে উল্লেখ করে শেখ আবদুল গফুর জালালী ‘আল ইসলাম’ ৫ম বর্ষ, ৩য় সংখ্যায় ‘শিক্ষা বিস্তারের উপায়’ প্রবন্ধে বলেন―
‘বাঙ্গালা দেশে জন্মগ্রহণ করিয়া, বাঙ্গলার জলবায়ুতে দেহপুষ্ট করিয়া যাহারা মাতৃঅঙ্ক হইতে বাঙ্গালা কথা শুনিয়া আসিয়াছেন এবং মাতৃস্তন পানের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙ্গালা কথা শিক্ষা করিয়াছেন তাহারাই আবার বাঙ্গালাকে মাতৃভাষা বলিয়া স্বীকার করিতে নাসিক্য কুঞ্চন করিয়া থাকেন। যাহারা উর্দ্দুকে মাতৃভাষা করিবার কল্পনা জল্পনা আঁটিতেছেন, তাহাদের এই উদ্ভট কল্পনা আলাদিনের বিচিত্র প্রদীপ অপেক্ষাও বিস্ময়াবহ বটে।’
এরই পরিপ্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘কৃষ্টি’ নামক এক পত্রিকার ১৩৫৪ এর কার্তিক সংখ্যায় ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ এনামুল হক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার উপযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন,
‘ইহাতে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সর্বনাশ হইবে। উর্দু বাহিয়া আসিবে পূর্ব পাকিস্তানবাসীর মরণ, …রাজনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মৃত্যু। এই রাষ্ট্রীয় ভাষার সূত্র ধরিয়া শাসন, ব্যবসা বাণিজ্য ইত্যাদি সর্ববিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান হইবে উত্তর ভারতীয় ও পশ্চিম পাকিস্তানী উর্দু ওয়ালাদের শাসন ও শোষণের ক্ষেত্র, যেমন ভারত ছিল ইংরেজী রাষ্ট্রভাষার সূত্রে শাসন ও শোষণের ক্ষেত্র’৭
১৯৪৭ সালে আগস্ট মাসে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান খান সাহেব আবুল হাসনাতের বেচারাম দেউরির বাসভবনে শুরু হওয়া সম্মেলনে ৭ সেপ্টেম্বর সাবজেক্ট কমিটির গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়―
‘বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হোক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’

বাংলা, পাকিস্তান ও ভারত সৃষ্টির আগে তথা ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছাত্র ফেডারেশন কর্মী শহীদ সাবের ও সাইমুম শমসের কক্সবাজার থেকে জাগরণ নামে একটি সাহিত্য প্রকাশ করেন। ‘জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত’ সেøাগানে প্রকাশিত ‘জাগরণ’-এ বাংলা ভাষার স্বীকৃতি দানের বিষয়টি তুলে ধরে সম্পাদকীয় লেখেন শহীদ সাবের।
এ কে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২) উত্থাপিত ও চৌধুরী খালেকুজ্জামান (১৮৮৯-১৯৬০) সমর্থিত লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগুরু মুসলিম অঞ্চলগুলি নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (ওহফবঢ়বহফধহঃ ঝঃধঃবং) গঠনের কথা উল্লেখ থাকলেও ১৯৪৬ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে মুসলিম আইন পরিষদ সম্মেলনে বাংলার প্রতিনিধিদের প্রতিবাদকে স্তব্ধ করে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮) ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States) থেকে ‘এস’ কে অসাবধানতাপ্রসূত ও ছাপাখানার ভুল বলে উল্লেখপূর্বক ‘পাকিস্তান’ এর পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করেন। ফলে আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের মিথ্যা প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়ে এ সময় সারা প্রদেশের ন্যায় চট্টগ্রামের অধিকাংশ নেতা পাকিস্তান আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ওই ইস্যুকে ঘিরে অনুষ্ঠিত ১৯৪৬ এর প্রাদেশিক নির্বাচনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু ওই নির্বাচন হয়েছিল প্রদেশগুলোতে সরকার গঠনের জন্যে। কোনো প্রদেশ বিভক্ত করার কথা ছিলো না। কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও কূটকৌশলের কাছে ভারতের স্বাধীনতার জন্য সা¤্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বকারী প্রধান দল ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এর মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮), প-িত জওহরলাল নেহেরু (১৮৮৯-১৯৬৪), সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল (১৮৭৫-১৯৫০) প্রমুখ কংগেস নেতা হার মানে। বৃটিশ শাসকদের সর্বশেষ প্রতিনিধি ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটনের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ও তত্ত্বাবধানে ভারতবর্ষের পশ্চিমাঞ্চলের-রাজস্থানের অংশ বিশেষ নিয়ে গঠিত সিন্ধু, পাঞ্জাবের পশ্চিম অংশ নিয়ে গঠিত পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (যা আফগানিস্তানের পাখতুন অঞ্চল নামে পরিচিত ছিল) এবং পূর্বাঞ্চলে তৎকালে পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব বাংলা নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ নিয়ে গঠিত হয় একটি নতুন রাষ্ট্র, যার নাম পাকিস্তান। এই পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে প্রায় ১২০০ মাইল ব্যবধান; মধ্যবর্তী ভূভাগের পুরোটাই ভারতের। পরবর্তীতে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে পূর্বাংশের নাম দেওয়া হয় পূর্ব বাঙলা (পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশ) আর পশ্চিমাংশের চার প্রদেশকে (পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান) একত্রে নাম দেওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তান। যে নির্বাচনের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হয় সে নির্বাচনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের দাবিদার নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কেবল পূর্বে বাংলাদেশ ও সিন্ধুতে সরকার গঠন করতে পারে। পাঞ্জাবে সরকার গঠন করে ইউনিয়নিস্ট পার্টি, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তানে কংগ্রেস। অর্থাৎ এই প্রদেশসমুহে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। সেই মতে, কেবল পশ্চিমে সিন্ধু ও পূর্বে বাংলাদেশ নিয়ে পাকিস্তান হওয়া উচিত ছিল। বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের শেষ সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম (১৯০৫-১৯৯৪), নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫)’র বড় ভাই কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু (১৮৮৯-১৯৫০) এবং কংগ্রেস নেতা কিরণ শঙ্কর রায় (১৮৯১-১৯৫১), প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখের দাবি মোতাবেক বঙ্গদেশ তথা বাংলাদেশকে (আজকের পশ্চিমবঙ্গ-ত্রিপুরা-আসাম ও বাংলাদেশ) একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নেয়া যেতো। যদি সেটাই হতো তাহলে ১৯৪০ সালে বাংলার বাঘ এ কে ফজলুল হক উত্থাপিত ও চৌধুরী খালেকুজ্জামান সমর্থিত লাহোর প্রস্তাবের ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (ওহফবঢ়বহফধহঃ ঝঃধঃবং) এর সাথে সংগতিপূর্ণ। তাহলে বাংলা হতো নিখিল বঙ্গভূমির বিরাট এক জনগোষ্ঠীর অবিসংবাদিত রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু বাস্তবে তা না করে, জনগণের কোনো ম্যা-েট না নিয়েই পশ্চিম পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশকে পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দেয়। আর পূর্ব পাঞ্জাব এবং বঙ্গদেশের পশ্চিম অংশ ও উত্তরাঞ্চলের অনেকটা তুলে দেয়া হয় ভারতের হাতে। মোটকথা ভারত বিভাগ ছিল ভারত জাতীয় কংগ্রেস ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অদূরদর্শী ও স্বার্থপর কিছু নেতার দ্বারা বানরের পিঠা ভাগের মতো।
১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান ও ভারত নামক পৃথক দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে বৃটিশরা ভারতবর্ষ থেকে বিতাড়িত হন। ভারত বিভক্তির সাথে সাথে পূর্বাঞ্চলের বেশিরভাগ বিত্তবান শিক্ষিত হিন্দুরা চলে গেলো পশ্চিমবঙ্গে আর অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান যারা শিক্ষিত ও নগরকেন্দ্রিক হয়ে উঠলো, তারা যেন রাতারাতি আরব সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ধর্মের আবেগে পাকিস্তানি ভাবধারায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো। ফলে সংস্কৃতির অঙ্গনে দেখা দিল শূন্যতা। তবে বাঙালি মুসলমানদের পাকিস্তান প্রেমের আচ্ছন্নতা কেটে যেতে বেশি সময় লাগেনি। পাকিস্তান কায়েমের এক বছরের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি নিষ্পত্তি না করেই এনভেলাপ, পোস্টকার্ড, ডাকটিকেট, মানি অর্ডার, ট্রেন টিকেট ও টাকার উপর উর্দু এবং ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে বাঙালির ভাষা-সংস্কৃতিতে আঘাত শুরু করে। এ প্রেক্ষাপটে পটিয়ার কৃতিসন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাসেম (১৯২০-১৯৯১) পাকিস্তান সৃষ্টির ১৭ দিনের মাথায় ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় গঠন করেন ‘তমদ্দুন মজলিস’। অনেকটা ইসলামী তমদ্দুনকে সমুন্নত করার প্রত্যয়ে এ সংগঠন গঠিত হলেও এ সংগঠনই প্রথম বাংলা ভাষার দাবিতে প্রতিবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন। এর ধারাবাহিকতায় ওই সনের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস থেকে প্রকাশিত হয় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না ঊর্দু’ শিরোনামে পুস্তিকা। এই পুস্তিকায় অধ্যাপক আবুল কাসেম ‘আমাদের প্রস্তাব’, ড. কাজী মোতাহের হোসেন ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ এবং আবুল মনসুর আহমদ (১৮৯৭-১৯৭৯) ‘বাংলাই আমাদের রাষ্ট্রভাষা হইবে’ নামক তিনটি প্রবন্ধ লিখে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে পাকিস্তান আমলে প্রথম আন্দোলন সংগঠিত করেন। এ পুস্তিকায় ‘আমাদের প্রস্তাব’ প্রবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পাশাপাশি তমদ্দুন মজলিস কর্তৃক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসন অন্যথায় স্বাধীনতার দাবি তোলা হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর বিকালে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ঢাকা সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (ঢাকা কলেজ) ছাত্রাবাস নূপুর ভিলায় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু করা হোক’ শীর্ষক এক ঘরোয়া সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না ঊর্দু’ শিরোনামের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ঘোষণাপত্রের উপর বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং ঘোষণাপত্র মতে কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ঐক্যমত হয়। এ সেমিনারে অংশ নেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম, ড. কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১), প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮), কবি জসীম উদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬), অধ্যাপক কাজী আকরাম হোসেন, অধ্যাপক শামসুল হক, শাহেদ আলী (১৯২৫-২০০২), সানাউল্লাহ নূরী (১৯২৮-২০০১)। ভাষা আন্দোলনের প্রথম ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গণ্য এ পুস্তিকা জনমনে রেখাপাত করে এবং ব্যাপক জনমত তৈরি করে। এ অবস্থায় তমদ্দুন মজলিস মাওলানা আকরাম খাঁ (১৮৭০-১৯৬৮), মাওলানা আব্দুল্লাহিল বাকী (মেম্বার অব লেজিসলেটিভ এসেম্বলী), আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩), আবুল কালাম শামসুদ্দিন (১৮৯৭-১৯৭৮), শামসুন নাহার মাহমুদ (১৮৮৮-১৯৬৪)সহ হাজারো মানুষের দস্তখত সংগ্রহ করে তা স্মারকলিপি আকারে ১৯৪৭ সালের ১৪ নভেম্বর পূর্ব বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীনকে প্রদান করে। কিন্তু এতেও শাসক দলের টনক না নড়ায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে সভা সমাবেশের আয়োজনে নামে। ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে প্রথম জনসভা হয়। তমদ্দুন মজলিসের কর্ণধার অধ্যাপক আবুল কাসেম এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের (বর্তমানে ছাত্র সংসদ) ভাইস প্রেসিডেন্ট ফরিদ আহমদ (১৯২৩-১৯৭১; পরবর্তীতে মৌলভী ফরিদ আহমদ নামে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে পরিচিত এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে ঘৃণিত হন ও নিহত হন), অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১; শহিদ বুদ্ধিজীবী), আবদুর রহমান চৌধুরী (১৯২৬-১৯৯৪; পরবর্তীতে বিচারপতি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক এ কে এম আহসান (পরে সিএসপি/সচিব), কল্যাণ দাশগুপ্ত, এস. আহমদ প্রমুখ।
ডাকসু’র সভাপতি হিসেবে ফরিদ আহমদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা এবং শিক্ষার মাধ্যম করার লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন। উত্থাপিত প্রস্তাব জানার সুবিধার্থে নি¤েœ প্রদত্ত হলো:
(ক) বাংলাকে পাকিস্তান ডোমিনিয়নের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার বাহন করা হোক।
(খ) রাষ্ট্রভাষা ও লিংগুয়া ফ্রাংকা নিয়ে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হচ্ছে তার মূল উদ্দেশ্য আসল সমস্যাকে ধামাচাপা দেয়া এবং বাংলা ভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা।
(গ) পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ফজলুর রহমান এবং প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ বাহার (১৯০৬-১৯৬৬) উর্দু ভাষার দাবিকে সমর্থন করার জন্য সভা তাঁদের আচরণের নিন্দা করছে।
(ঘ) সভা মর্নিং নিউজ এর বাঙলা বিরোধী প্রচারণার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছে এবং জনসাধারণের ইচ্ছার প্রতি অবক্ষা প্রদর্শনের জন্য পত্রিকাটিকে সাবধান করে দিচ্ছে।৮
ফরিদ আহমদ তখন একদিকে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র, তেমনি অন্য দিকে ঢাকা গভর্নমেন্ট কলেজ এর ইংরেজি অধ্যাপক ছিলেন। সভাশেষে অধ্যাপক আবুল কাসেম এর নেতৃত্বে একটি বিশাল মিছিল সহকারে সেক্রেটারিয়েট অভিমূখে গমন করে মুখ্যমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন, নুরুল আমিন, সৈয়দ আফজালের বাসভবন ও সেক্রেটারিয়েট ঘেরাও করা হয়।৯ এভাবে ধীরে ধীরে ভাষা আন্দোলন অঙ্কুরিত হতে থাকে। এরইমধ্যে ১৯৪৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে রাষ্ট্রভাষা সাব কমিটি নামে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে গঠিত প্রথম এ সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নিযুক্ত হন ঢাবির তরুন অধ্যাপক ড. নুরুল হক ভূঁইয়া (১৯২৩-১৯৯৮), সদস্য- অধ্যাপক আবুল কাসেম, অধ্যাপক আবদুল গফুর, গণতান্ত্রিক যুবলীগের কমরেড মো. তোয়াহা (১৯২২-১৯৮৭), ডাকসু ভিপি ফরিদ আহমদ (১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তান শান্তি ও কল্যাণ পরিষদ এর সভাপতি) অলি আহাদ, ফজলুর রহমান ভুঁইয়া (এসএম হলের প্রচার সম্পাদক), শামসুল আলম (১৯২৬-১৯৯৪; এসএম হলের সমাজসেবা সম্পাদক), শওকত আলী (১৯২৮-১৯৭৫), সৈয়দ নজরুল ইসলাম (১৯২৬-১৯৭৫; এসএম হলের ভিপি ও তমদ্দুন মজলিসের সদস্য ও পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি), আজিজ আহমদ (১৯১৬-১৯৬৫), প্রকৌশলী আজিজুর রহমান, আখলাকুর রহমান, আবদুল মতিন খান চৌধুরী, আবুল খায়ের (নোয়াখালী থেকে তৎকালীন আইন পরিষদ সদস্য), আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, প্রকৌশলী নুরুল হুদা (১৯২৪-২০০৭; ঢাকা ই্িঞ্জনিয়ারিং কলেজ প্রতিনিধি), মির্জা মাজহারুল ইসলাম (ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিনিধি), সিদ্দিক উল্লাহ (জিএস, এসএম হল), এ কে এম আহসান, শাহেদ আলী, সানাউল্লাহ নূরী, অধ্যাপক রেয়াত খান (একমাত্র উর্দুভাষী সদস্য), খালেক নেওয়াজ খান (১৯২৬-১৯৭১), আবদুল মান্নান, কামরুদ্দিন আহমদ (১৯১২-১৯৮২), আবদুর রহমান চৌধুরী, আনোয়ারা খাতুন (১৯১৯-১৯৮৮), নুরুল আলম (টাঙ্গাইল), লিলি খান, নইমুদ্দিন আহমদ (১৯২৪-১৯৬৯), রণেশ দাশগুপ্ত (১৯১২-১৯৯৭), সরদার ফজলুল করিম (১৯২৫-২০১৪) প্রমুখ।
ইতোমধ্যে ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার বিষয় তালিকা হতে বাংলা ভাষাকে বাদ দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। এর প্রতিবাদ করায় এবং ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে পূর্ব পাকিস্তানের চীফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদ ঢাকা সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) লেকচারার ফরিদ আহমদকে ডেকে সতর্ক করে দিলে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার বিষয় তালিকা হতে বাংলা ভাষাকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ৬ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ভাষায়―

‘ঢাকা, ৬ই জানুয়ারী। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার বিষয় তালিকা হতে বাংলা ভাষাকে বাদ দেয়ার প্রতিবাদে এবং অন্যান্য কয়েকটি কারণে ঢাকার সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ইংরেজির লেকচারার মি: ফরিদ আহমদ পদত্যাগ করেছেন।’ – এ, পি (সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ জানুয়ারী ১৯৪৮)
সরকারি চাকুরী থেকে ইস্তফাদানকারী ফরিদ আহমদ কক্সবাজারের সন্তান হওয়ায় চট্টগ্রাম জেলা জুড়ে এ খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অবস্থানগত দিক দিয়ে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের মহকুমা কক্সবাজারের রামুতেও এ খরবটি পৌঁছে। অনেক আগে থেকেই তথা খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আবদুল মজিদ সিকদার, মাওলানা মজহেরুল হক চৌধুরী, রাস মোহন বড়–য়ার বদৌলতে রাজনৈতিক দিক থেকে রামুর পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত রামু খিজারী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কক্সবাজারে ভাষা আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। ওই স্কুলের ১০ম শ্রেণির ছাত্র মো. বদরুজ্জামান (পরবর্তীতে ডা. এম বি জামান নামে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ), নবম শ্রেণির ছাত্র ওবায়দুল হক (যিনি ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে কক্সবাজার মহকুমা থেকে মুসলিম লীগের প্রার্থী কবির আহমদ চৌধুরীর একজন ক্ষুদে কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে ফতেখাঁরকুল ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন), রসিক চন্দ্র বড়–য়া, ৮ম শ্রেণির ছাত্র নুরুল ইসলাম হেলালী (পরবর্তীতে অধ্যাপক, বর্তমানে বাংলাদেশ লেখক শিবির-চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি) প্রমুখের নেতৃত্বে তৎক্ষনাৎ ক্লাস বর্জন করে মিছিল বের হয়ে রামু চৌমুহনীতে মিলিত হন। এ দিকে বড় ভাইদের মিছিলে অংশগ্রহণ দেখে রামু সেন্ট্রাল প্রাইমারী স্কুলের ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র আমিরুল কবির চৌধুরী, মোশতাক আহমদ (প্রফেসর), ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী (১৯৩৭-২০১০) প্রমুখ মিছিলে যোগ দেন। মিছিল পরবর্তী সময়ে চৌমুহনীতে এক জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় বক্তব্য রাখেন মো. বদরুজ্জামান (১৯৩০-২০০৮), ওবায়দুল হক (১৯৩২-২০১২), রসিক চন্দ্র বড়–য়া, জাকের আহমদ, মোশতাক আহমদ, আমিরুল কবির চৌধুরী প্রমুখ। ওই সমাবেশে আমিরুল কবির চৌধুরী জীবনের প্রথম বক্তৃতা করেছেন বলে তার ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কক্সবাজার’ শীর্ষক লেখায় উল্লেখ করেছেন। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণির একজন ছাত্র হয়ে কীভাবে বক্তৃতা রাখতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে। ওই সমাবেশ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
১৯৪৮ সালের ৬ জানুয়ারি মৌলভী ফরিদ আহমদ অধ্যাপক পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে কক্সবাজারে চলে আসেন এবং কক্সবাজারের সচেতন ব্যক্তি, ছাত্রদের মাঝে রাজনৈতিক চেতনা সঞ্চার করেন। ওই সময় কক্সবাজার সরকারি বিদ্যালয় সংলগ্ন বেণী মাধব পাল এবং বর্তমান নিরিবিলি হোটেলস্থ এডভোকেট নলিশী রঞ্জন দত্তের বাসগৃহে (বর্তমান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন) বৈঠকে রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন বলে ভাষাসংগ্রামীদের স্মৃতিকথায় উঠে আসে।
এ ধরনের বৈঠকে এডভোকেট প্রবোধ রঞ্জিত, এ্যাডভোকেট সুরেশ সেন, এম.এ. সালাম (প্রাক্তন পৌর চেয়ারম্যান ও মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষালম্বন করে শান্তি কমিটির দায়িত্ব নেন), মহিউদ্দিন মোক্তার (পরবর্তীতে কক্সবাজার মহকুমা আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক) প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা করতেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র সাত মাসের ব্যবধানের মধ্যে পাকিস্তানের সামন্তবাদী ও সা¤্রাজ্যবাদী স্বার্থ-গোষ্ঠীর আসল চরিত্র ফুঠে ওঠে। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণ-পরিষদের অধিবেশনে মুসলিম সরকার উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। মুসলিম লীগের মুসলিম জনপ্রতিনিধির কেউ এর প্রতিবাদ না করলেও পূর্ব বাঙলার সদস্য কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত (১৮৮৬-১৯৭১; মুক্তিযুদ্ধে শহীদ) গণপরিষদের সেই সিদ্ধান্তের সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করে বাংলা ভাষা ব্যবহারের পক্ষে প্রস্তাব উত্থাপন করলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান (১৮৯৬-১৯৫১), ওই অধিবেশনের সহ-সভাপতি তমিজ উদ্দিন খান (১৮৮৯-১৯৬৩), পূর্ব বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন (১৮৯৪-১৯৬৪), পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও পুনবার্সন মন্ত্রী গজনফর আলীর তীব্র বিরোধিতার মুখে তা নাকচ হয়ে যায়। লিয়াকত আলী খান ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের দেশপ্রেমের প্রতি কটাক্ষ করে বলেন, ‘মাননীয় সদস্য পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ভুল ধারণা, মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং সৃষ্টির অবাঞ্ছিত উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলার প্রশ্ন উত্থাপন করেন। খাজা নাজিম উদ্দিন তখন সদম্ভে ঘোষণা করেন―‘পূর্ববাংলার অধিকাংশ অধিবাসীরই এ মনোভাব যে একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।’
মোহাজির ও পুনর্বাসন মন্ত্রী গজনফর আলি খান প্রস্তাবটির বিরোধিতা ও উর্দু ভাষার সাফাই গেয়ে বলেন, ‘পাকিস্তানের একটিমাত্র সাধারণ ভাষা থাকবে এবং সে ভাষা হবে উর্দু। আমি আশা করি, অচিরেই সমস্ত পাকিস্তানি ভালোভাবে উর্দু শিক্ষা গ্রহণ করে উর্দুতে কথাবার্তা বলাবলিতে সক্ষম হবে।’ সেই সাথে তিনি উর্দু ভাষার সঙ্গে ইসলামী সংস্কৃতির যোগসূত্র আবিষ্কার করে বলেন, ‘উর্দু কোনো প্রদেশের ভাষা নয়, তা হচ্ছে মুসলিম সংস্কৃতির ভাষা। উর্দু ভাষাই হচ্ছে মুসলিম সংস্কৃতি। ’১০
পক্ষান্তরে গণপরিষদে কংগ্রেস দলের সম্পাদক রাজকুমার চক্রবর্তী সংশোধনী প্রস্তাবের সমর্থনে বলেন―
উর্দু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশেরই কথ্য ভাষা নয়। তা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানের উপরতলার কিছু মানুষের ভাষা। … বাংলাকে আমরা দুই অংশের সাধারণ ভাষা করার জন্য কোনো চাপ দিচ্ছি না। আমরা শুধু চাই পরিষদের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলারও স্বীকৃতি।’
কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেদিন তার দল কংগ্রেস এর হিন্দু সদস্য শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভুপেন্দ্র কুমার দত্ত, প্রেমহরি বর্মা, প্রভাষ লাহিড়ী ছাড়া আর কোনো পূর্ব বঙ্গীয় প্রতিনিধির সমর্থন পায়নি। ফলে সংশোধনী প্রস্তাবটি সাম্প্রদায়িকতায় গিয়ে পৌঁছায়।
গণপরিষদের অন্যতম ব্যবহারিক ভাষা বাংলা করার বিপক্ষে পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগ দলীয় বাঙালি প্রতিনিধিদের ভোট দেওয়ার খবর এসে পৌঁছলে ঢাকা ছাত্র সমাজে এবং পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর প্রেক্ষিতে ওই সময় তমদ্দুন মজলিস পাকিস্তানে একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটিতে অন্যান্য দলের লোক অন্তর্ভুক্ত করে শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটিকে সম্প্রসারিত করে ২ মার্চ ১৯৪৮। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ঢাকায় এক সভায় মিলিত হয়ে ১১ মার্চ ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১১, ১২, ১৩ মার্চের প্রতিবাদ দিবস প্রদেশব্যাপী পালন করা হয়। এর প্রভাব কক্সবাজার জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
১১ মার্চের প্রবল ছাত্র বিক্ষোভের পর খাজা নাজিম উদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে ৮ দফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

ভাষাচুক্তির ৮ দফা সংক্ষেপে নিম্নরূপ :
১। ২৯ শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ থেকে বাংলা ভাষা প্রশ্নে যাঁদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁদেরক অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হবে।
২। পুলিশী নির্যাতনের অভিযোগ সম্পর্কে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তদন্ত করে এক মাসের মধ্যে বিবৃতি দিবেন।
৩। ১৯৪৮ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক সভায় বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার এবং বাংলাকে পাকিস্তান গণপরিষদে ও কেন্দ্রীয় সরকারের পরীক্ষাদিতে স্থান দেওয়ার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
৪। ব্যবস্থাপক সভায় বাংলাকে প্রদেশের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
৫। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবেনা।
৬। আন্দোলন সমর্থনকারী সংবাদপত্রগুলির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
৭। যেসব স্থানে ভাষা আন্দোলনের জন্য ১৪৪ ধারা জারী করা হয়েছে সেখান থেকে তা প্রত্যাহার করা হবে।
(সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের দাবির মুখে খাজা নাজিমুদ্দিন নীচের দফাটি নিজ হাতে লিখে দেন)।
৮। সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনায় আমি নিঃসন্দেহে হয়েছি যে, এ আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত নয়।

যদিও জিন্নাহ তা পরে অস্বীকার করে ‘এটা জোর করে আদায় করা হয়েছে মর্মে ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঘোষণা করে বলেন―
The State language therefore, must obviously be Urdu, a language that has been nurtured by a hundred million Muslims of this sub-continent, a language understood throughout the length and breadth of Pakistan and above all a language which, more than any other provincial language, embodies the best that is in Islamic culture and Muslim tradition and is nearest to the language used in other Islamic countries.”
পাকিস্তানের গভর্নর মুহম্মাদ আলী জিন্নাহ মনে করেছিলেন, কয়েক শতাব্দী আগে বাংলাদেশকে শাসন ও শোষণ করতে এসে সংস্কৃত ভাষাভিমানী ব্রাহ্মণ শাসকেরা যেমন ‘বাংলা রৌরব নরকের ভাষা’ বলে ঘোষণা করে অত্যাচার শুরু করেছিলেন বাংলাভাষাভাষী স্থানীয় লোকদের উপর―যার পরিণামে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপাল ও অন্যান্য দেশে; ঠিক তেমনি বিশ শতকের মধ্যপাদেও উর্দুভাষী শাসক জিন্নাহর ঘোষণায় পাকিস্তানের নেটিভ বাঙালি প্রজারা তাই করবে।১১ কিন্তু বাস্তবে তা হলো না। জিন্নাহ বক্তব্যের সময় আবদুল মতিন (ভাষা মতিন), পটিয়ার কৃতি সন্তান একেএম হাসান, নইমুদ্দিন, আতাউর রহমান খান ‘নো’, ‘নো’ বলে চিৎকারে তার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে জিন্নাহ বলেন, Its is my views পরক্ষণে তিনি কথা না বাড়িয়ে I hope Bengal will not fail me বলে বক্তব্য শেষ করেন। ওই দিন বিকেলে তমদ্দুন মজলিসের অধ্যাপক আবুল কাসেম, শামসুল হক, তাজউদ্দিন আহমদ, লিলি খান, আজিজ আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কমরেড মো. তোয়াহা, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন ও এম শামসুল আলমের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে দেখা করেন। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে চলা এ বৈঠকে জিন্নাহ প্রতিনিধি দলকে পাকিস্তানের সংহতির স্বার্থে এক রাষ্ট্রভাষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এ নিয়ে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে জিন্নাহর তর্ক হয়। তর্কের এক পর্যায়ে মাগরিবের আজান দিলে নামাজের বিরতিতে শামসুল হক জিন্নাহকে নামায পড়ার আহ্বান জানালে পরিবেশ জটিল হয়ে পড়ে (জিন্নাহ ইসলামকে ভালবেসে পাকিস্তান আন্দোলন, পাকিস্তানের জনক; উর্দুকে ভালবাসলেও বিলেত ফেরত ব্যক্তি হিসেবে নামাজ পড়েননি তেমন, পাশাপাশি নামাজ কিভাবে পড়তে হয় তাও জানতেন না, ব্যক্তিগত স্বার্থে নেতা হওয়ার জন্য মুসলিম লীগের সাথে জড়িত হয়েছিলেন। যার কারণে প্রতিনিধিদলের নেতা শামসুল হক নামাজ পড়ার কথা বললে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়)।১২ এতে বিতর্ক সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। ভাষা প্রশ্নে শেষ না হলেও প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে জিন্নাহকে স্মারকলিপি প্রদান করে।
জিন্নাহ ঢাকা সফর শেষে চট্টগ্রাম সফরে আসেন। ১৯৪৮ সালের ২৫-২৭ মার্চ চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনে অবস্থানকালে উর্দু ভাষার পক্ষে এবং আরবী হরফে বাংলা লেখার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। মুসলিম লীগ নেতা এ কে খান ও আহমদ সগীর চৌধুরী এ সভায় বক্তব্য রাখলেও জিন্নাহ সভায় উর্দুর পক্ষে বলায় শ্রোতাদের মধ্যে থেকে জোরালো কোনো প্রতিবাদ হয়নি। কিন্তু এ খবরটি বাইরে প্রচার হলে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। চট্টগ্রামের ছাত্র সমাজ ক্ষোভে ফেটে উঠে। এর কয়েকদিন পর চট্টগ্রামে সাহিত্যিক মাহবুব আলম চৌধুরী (১৯২৭-২০০৭), গোপাল বিশ্বাস, ফরমান উল্লাহ খান ও শহিদ সাবের (পরবর্তীতে একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবী) প্রমুখ মিলে ‘সংস্কৃতি বৈঠক’, ‘তমদ্দুন মজলিস’, ‘ছাত্র ফেডারেশন’ প্রভৃতি সমমনা দল নিয়ে জেএমসেন হলে জিন্নাহর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় এক সভার ডাক দেয়। প্রতিবাদ সভার প্রচারের জন্য ঘোড়ারগাড়ি নিয়ে মাইকে প্রচারের সময় মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল অংশের ভাড়াটে গুন্ডারা কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবাধীন মাহবুব আলম চৌধুরী, ছাত্র ফেডারেশন নেতা শহিদ সাবের (একাত্তরের শহিদ বুদ্ধিজীবী) ও সাহিত্যিক গোপাল বিশ্বাসের উপর হামলা করে। হামলাকারীরা সেদিন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সভাপতিত্বে নির্ধারিত সভাও প- করে।১৩
এ প্রেক্ষাপটে একই সালের ১৫ মার্চের চুক্তি ভঙ্গ করে তার ২০ দিন পর অর্থাৎ ৬ এপ্রিল পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক সভায় ভাষাচুক্তি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ব্যবস্থাপক সভার বিরোধীদলীয় নেতা বসন্ত কুমার দাস সে চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিলে নাজিমুদ্দীন সেকথা অগ্রাহ করে বলেন―‘সুপারিশ করতে হলে তা গভর্নরের মাধ্যমেই করতে হবে’। তিনি চুক্তির কথা উল্লেখ করে আরো বলেন―
‘ভাষার এই প্রশ্নটি মি: দত্ত এবং তার পার্টির কয়েকজন এখানে উত্থাপন করেছেন। তাঁরা ১৫ মার্চের সেই তারিখটির এবং আমি যে চুক্তি করেছিলাম, তা রেখেছেন। কিন্তু ২১ মার্চ অথবা ২৪ মার্চ যা ঘটেছিল, তার সবকিছু ভুলে গেছেন। তারা পাকিস্তানের প্রতি অনুগত, তারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতিও অনুগত; কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান যা বলেন, তার কিছুই তাঁদের মনে থাকে না।’’

তিনি জিন্নাহর ঘোষণার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন―
‘পাকিস্তানের মঙ্গল কীসের মধ্যে নিহিত, সেটা অন্য যে কোনো ব্যক্তির নিকট থেকে কায়েদে আজমই যে বেশি বোঝেন, এ কথাও আমি তাদের বিবেচনা করতে বলি। যে ব্যক্তি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও গঠন করেছেন, তিনি বলেছেন যে রাষ্ট্রের স্বার্থেই তা করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও এই ভাষার প্রশ্নটি যে এখানে আনা হয়েছে, সেটা আমার পক্ষে একটা দুর্ভাগ্যের বিষয়।’
পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বাংলা ভাষাকে পূর্ব বাংলার সরকারি ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম করার জন্য প্রথমেই একটি প্রস্তাব পেশ করেন। সম্ভবত সেটিই ছিল সরকারি প্রস্তাব। প্রস্তাবে বলা হয়:
ক. পূর্ববাংলা প্রদেশে ইংরেজির স্থলে বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করিতে হইবে; এবং
খ. পূর্ববাংলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে শিক্ষার মাধ্যম হইবে যথাসম্ভব বাংলা অথবা প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশ স্কলারদের মাতৃভাষা। আপাতদৃষ্টিতে প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে হলেও বিরোধী দলীয় কংগ্রেস নেতা বসন্তকুমার দাস প্রস্তাবটির ওপর আলোচনার জন্য সময় প্রার্থনা করেন। একদিন মুলতবির পর ৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় সভার কাজ পুনরায় শুরু হলে প্রথমেই বিরোধী দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সরকারি প্রস্তাবের ওপর নি¤œলিখিত সংশোধনী পেশ করেন―
১. এই পরিষদের অভিমত হল এই যে―
ক) বাংলা পূর্ববাংলা প্রদেশের সরকারি ভাষারূপে গৃহীত হইবে;
খ) পূর্ববাংলা প্রদেশে ইংরেজির স্থলে বাংলা প্রবর্তনের জন্য আশু ব্যবস্থা অবলম্বন করিতে হইবে;
গ) পূর্ববাংলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার মাধ্যম হইবে বাংলা।
২। এই পরিষদ আরো মনে করেন যে, বাংলা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত;
৩। এই পরিষদ পাকিস্তান সরকারের নিকট সুপারিশন করে যে―
ক) সর্বপ্রকার নোট ও টাকা পয়সা, টেলিগ্রাফ, পোস্টকার্ড, ফর্ম, বই ইত্যাদি ডাক সংক্রান্ত যাবতীয় জিনিস, রেলওয়ে টিকিট এবং পাকিস্তান সরকারের অন্য সর্বপ্রকার সরকারি ও আধা-সরকারি ফার্মে অবিলম্বে বাংলা প্রচলন করা হউক;
খ) কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে এবং সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীতে যোগদানের জন্য সকল প্রকার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যম এবং অন্যতম বিষয় হিসেবে বাংলা প্রবর্তন করিতে হইবে এবং
৪। এই পরিষদ সংবিধান সভার সকল সদস্যকে অনুরোধ জানাইতেছে এবং পূর্ববাংলার প্রতিনিধিদের নিকট বিশেষভাবে আবেদন করিতেছে, যাহাতে তাহারা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার জন্য সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করেন।
ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বক্তৃতা দেন বাংলা ব্যবস্থাপক সভার সদস্য আবদুল বারী চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদ, অর্থ দফতরের মন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী, আবদুস সবুর খান, শামসুদ্দিন আহমদ খোন্দকার, প্রধানমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন প্রমুখ। কিন্তু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সেদিন তার দল কংগ্রেস এর হিন্দু সদস্য বসন্ত কুমার দাশ, বিনোদচন্দ্র চক্রবর্তী, সতীন্দ্রনাথ ভদ্র, অমূল্যচন্দ্র অধিকারী, সুরেশচন্দ্র দাসগুপ্ত, গোবিন্দলাল ব্যানার্জি, রাজেন্দ্রনাথ সরকার, মনোরঞ্জন ধর, পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত, শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভুপেন্দ্র কুমার দত্ত, প্রেমহরি বর্মা, প্রভাষ লাহিড়ী ছাড়া আর কোনো পূর্ব বঙ্গীয় প্রতিনিধির সমর্থন পায়নি। ফলে সংশোধনী প্রস্তাবটি সাম্প্রদায়িকতায় গিয়ে পৌঁছায়। প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যাওয়ার পর পরিষদের অনুমতি নিয়ে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রথম প্রস্তাবের চতুর্থ অংশ বাদ দিয়ে তিনি তার দ্বিতীয় প্রস্তাব পেশ করেন। দ্বিতীয় প্রস্তাবটিও বাতিল হয়ে গেলে তৃতীয় ও শেষ প্রস্তাব পেশ করেন। প্রথম প্রস্তাবের প্রথম অংশটি সামান্য পরিবর্তন করে তিনি শেষ প্রস্তাবটি পেশ করেন―

১। এই পরিষদের অভিমত যে,
(ক) বাংলা পূর্ববাংলা প্রদেশের সরকারি ভাষারূপে গৃহীত হইবে।
(খ) দুই বৎসরের মধ্যে পূর্ব বাংলা প্রদেশে ইংরেজির স্থলে বাংলা প্রবর্তনের জন্য আশু ব্যবস্থা অবলম্বন করিতে হইবে।
(গ) পূর্ববাংলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার মাধ্যম হইবে বাংলা।
দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে পরিষদের কাছে আবেদন করেন বলেন―‘৭ কোটি বাঙালির মধ্যে ৪ কোটির উপর পাকিস্তানী রয়েছে। তাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া যুক্তিসঙ্গত, এইজন্য আমি এই দাবি উত্থাপন করেছিলাম। আমি আশা করি, মন্ত্রীম-লী এবং জনগণের প্রতিনিধি যারা আছেন তারা জনগণের এই দাবি সমর্থন করিবেন এবং নিজেরাই এই প্রস্তাব করিবেন। শুধু বাংলায় বক্তৃতা করলে চলিবে না। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিতে হইবে।’
পূর্ববাংলা ব্যবস্থাপক সভার বিরোধী দলীয় নেতা বসন্ত কুমার দাস আরেকটি সংশোধনী প্রস্তাব পেশ করেন। সেটি হলো:
(ক) পূর্ববাংলা প্রদেশের সকল অফিস এবং আদালতে ইংরেজির পরিবর্তে বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে গৃহীত হইবে এবং
(খ) পূর্ববাংলায় বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে বাঙালিদের শিক্ষার মাধ্যম হইবে বাংলা। ১৪
১৯৪৮ সালের ৮ এপ্রিল পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদ এর মূলতবি অধিবেশনে বাংলাকে (পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা না করে) কেবলমাত্র পূর্ব বাঙলার সরকারি ভাষারূপে ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রীর ইতোপূর্বে স্বাক্ষরিত ৮ দফা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে আরবি হরফে বাংলা লেখার অদ্ভুত সুপারিশ করে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শিক্ষাবোর্ড। যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সারা বাঙলায় ছড়িয়ে পড়ে আরবী হরফের বাংলার প্রতিরোধ আন্দোলন। পালিত হয় ধর্মঘটসহ নানা কর্মসূচী।
সারাদেশের প্রদেশের ন্যায় রামুতেও পালিত হয় ছাত্র ধর্মঘট। ১১ এপ্রিল মো. বদরুজ্জামানের (১৯৩০-২০০৮) নেতৃত্বে রামু খিজারী বিদ্যালয় থেকে মিছিল সহকারে বের হয়ে রামু চৌমুহনীতে জনসভায় মিলিত হয়। ওই সভায় ওবায়দুল হক (প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন কাউন্সিল), আফসার কামাল চৌধুরী, নুরুল ইসলাম হেলালী, রসিক চন্দ্র বড়–য়া, জাকের আহমদ (গর্জনিয়া), আমিরুল কবির চৌধুরী, মোশতাক আহমদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।১৫ ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে কক্সবাজারের অন্য কোথাও সক্রিয় অবদান আছে কিনা তা জানা যায়নি।
 Devo bubu Sir 1
 MN Nur AhamedJalal Ahmad chyEditor-dcFAZLUL KARIM-24muktijudda_baddsha miphotoSHAMSUL HUDA SIDDIQI-25
এরপরে ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গটির কথা তেমন ভাবে না উঠলেও ১৯৪৯ সালের দিকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামে সামান্য আন্দোলন চলে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। ১৯৪৯ সালের ৯ মার্চ গঠিত পূর্ব বঙ্গভাষা কমিটি ১৯৫০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব বাঙলার বিদ্যালয়সমূহে উর্দুকে সরকারি ভাষা করায় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির প্রতিবাদ সভা, ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান সফরে আসলে উর্দুর কথা বলায় তাকে অপমানসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে।
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মূল আঘাতটি আসে ১৯৫২ সালে। ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকারীদের দাবির প্রেক্ষিতে ১৫ মার্চ স্বাক্ষরিত ৮ দফা চুক্তি ভঙ্গ করে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে মুসলিম লীগের সম্মেলনে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পুনরায় ঘোষণা করেন―‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে একমাত্র উর্দু’ এবং ‘উর্দু হরফে বাংলা লিখনের প্রচেষ্টা সাফল্যমন্ডিত হইতেছে’। তার এ বক্তব্যে পূর্ব পাকিস্তানে জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালার মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর প্রতিবাদে ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের এক প্রতিবাদ সভা হয়। ৩০ জানুয়ারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ প্রতীকী ধর্মঘট পালন করে এবং বিভিন্ন শিক্ষায়তনের ছাত্রদের সহযোগে এক বিরাট শোভাযাত্রা বের করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ওই দিন নাজিমুদ্দিনের বক্তব্যের প্রতিবাদে পূর্ব পাক মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে বার লাইব্রেরি হলে আহুত সর্বদলীয় এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, খেলাফত রব্বানী পার্টি, যুব সংঘ, তমদ্দুন মজলিস, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, ইসলামী ভ্রাতৃসংঘ, পুর্ব পাকিস্তান জমিয়তে আরাবিয়া, মোহাজের সমিতিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ জন প্রতিনিধি সমন্বয়ে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে একটি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সর্বদলীয় সভায় বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা এবং কেন্দ্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের জন্য খাজা নাজিমুদ্দীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী থাকতে ১৫ মার্চ ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যে ৮ দফা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন তা ভঙ্গ করায় নিন্দা প্রকাশ করা হয় এবং অনতিবিলম্ভে ভাষা সম্পর্কিত তার উক্তির প্রত্যাহারপূর্বক বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার দাবি জানানো হয় এবং উর্দু হরফে বাংলা লেখার চক্রান্তের বিরুদ্ধেও এক প্রস্তাবে সরকারকে হুশিয়ারী করে দেয়া হয়।১৬
সংগ্রাম পরিষদ ৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার ঢাকা শহরের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ও প্রতিবাদ বিক্ষোভ, ১১ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পতাকা দিবস পালন করে এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সারা পূর্ব বাংলায় সভা, সমাবেশ, মিছিল ও হরতালের কর্মসূচী ঘোষণা করে। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এ লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার মধ্যে লাগাতার প্রচারণা শুরু করে। এই দিকে পূর্ব পাকিস্তান সরকার এতে বিচলিত হয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিকেলে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস.এইচ.কোরাইশি এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারার আদেশ জারি করে সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রা প্রভৃতি নিষিদ্ধ করে। নির্দেশে বলা হয়―
‘যেহেতু এটা দেখা যাচ্ছে যে, জনগণের একটি অংশ ঢাকা শহরে জনসভা, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ মিছিল সংঘটিত করার চেষ্টা করছে এবং যেহেতু, আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছি যে সেই ধরনের শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ মিছিল জনসাধারণের জীবনে শান্তি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করতে পারে, তাই আমি, এস.এইচ. কোরেশী সি.এস.পি, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, সি. আর.পি.সি-র ১৪৪ ধারা অনুযায়ী কোতোয়ালী, সূত্রাপুর, লালবাগ, রমনা ও তেজগাঁও পুলিশ স্টেশন নিয়ে গঠিত ঢাকা শহরের সমগ্র এলাকায় আমার লিখিত পূর্ব অনুমতি ব্যতিত ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ থেকে ত্রিশ দিনের জন্য সেই ধরনের সকল জনসভা, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি।’ ১৭
পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ১৪৪ ধারা জারির প্রেক্ষিতে ছাত্ররা আরো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ১৪৪ ধারা জারি ভঙ্গ করে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সকাল ১১ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে সমবেত হয় এবং তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মিছিল নিয়ে ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে। পথিমধ্যে পাহারারত পুলিশের কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ উপেক্ষা করে প্রাদেশিক পরিষদ ভবনকে ঘেরাও করার উদ্দেশ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গনে পৌঁছলে বিক্ষোভরত ছাত্রদের উপর পুলিশ গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ ক্লাসের ছাত্র মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন (্অবশ্য সালাহ উদ্দিন নামে কোনো ছাত্র শহীদ হয়নি বলে ভাষা ইতিহাস গবেষক ও ভাষা আন্দোলনকারীরা তাদের স্ব-স্ব-গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক লিখিত ‘ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য’ নামক গ্রন্থে যুক্তির মাধ্যমে মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র এবং বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের পুত্র রফিকুদ্দীন (১৯৩২-১৯৫২) কে সালাহ উদ্দিন নামে উল্লেখ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এবং ওই সময়ের বাংলা একাডেমির গ্রন্থাগারিক মুহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক এর জবানী উল্লেখ করার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আজাদ পত্রিকার কল্যাণে সালাহ উদ্দীনের শাহাদাত বরণের খবর প্রকাশিত হবার পর জনাব সালাহ উদ্দিন সশরীরে তার কর্মস্থলে এসে সবার সাথে দেখা করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে ১৮) ঘটনাস্থলে নিহত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল জাব্বার (৩০), আবুল বরকত (২৫), নবাবপুর রোডের রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমানের ছেলে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র অহিউল্লাহ, সলিমুল্লাহ মোছলেম হলের ছাত্র আনোয়ারুল এছলাম (২৪), জগন্নাথ কলেজের ছাত্র এ আর ফৈয়াজ (১৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সিরাজুদ্দীন খান (২২), সরকারি শুল্ক বিভাগের পিয়ন আবদুস সালাম (২৭), এলাহী বখশ (৪০), মনসুর আলী (১৬), বছিরুদীন আহমদ (১৬), তাজুল এছলাম (২২), মাছুদুর রহমান (১৬), আবদুস সালাম (২২), আখতারুজ্জামান (১৯), এ রেজ্জাক (১৭), মোজাম্মেল হক (২৩), সুলতান আহমদ (১৮), এ রশিদ (১৪), মোহাম্মদসহ বহু সংখ্যক ছাত্র ও পথচারী আহত হয়।
পরে ওই দিন রাতে আবদুল জাব্বার (৩০), আবুল বরকত (২৫), নবাবপুর রোডের রাজমিস্ত্রি হাবিবুর রহমানের ছেলে তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র অহিউল্লাহ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান এবং দৈনিক আজাদ’র ৮ এপ্রিল ১৯৫২- সংখ্যার সংবাদ অনুযায়ী, ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে পুলিশের গুলিতে আহত সরকারি শুল্ক বিভাগের পিয়ন আবদুস সালাম (২৭) প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টায় ঢাকা হাইকোর্টের কর্মচারী সফিউর রহমান নবাবপুর রোড হয়ে কাজে যাওয়ার পথে পুলিশের গুলিতে আহত হয়। ওই দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডা. এ্যালিনসন এর তত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যা ৬টায় মারা যান।
এ খবর সারা দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ২২ ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ অধিবেশন চলাকালে পরিষদ হতে আজাদ সম্পাদক ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য আবুল কালাম শামসুদ্দিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি শনিবার পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ (১৯০০-১৯৮৬) লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি হতে ও ঢাকায় ১৪৪ ধারার প্রবর্তন এবং ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য আহমদ হোসেন, খয়রাত হোসেন মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি এবং প্রাদেশিক লীগ ওয়ার্কিং কমিটির পদ থেকে এস্তেফা দেন। এ সময় পূর্ববাঙলা ব্যবস্থা পরিষদের মুসলিম ও কংগ্রেস দলীয় ১২ জন সদস্য ওয়াকআউট করেন। তার মধ্যে খয়রাত হোসেন (১৯১১-১৯৭২), রাজশাহীর মনির উদ্দিন আখন্দ, আলী আহমদ খান, আলী আহমদ চৌধুরী, মোবারক আলী, বসন্ত কুমার দাশ, শামসুদ্দিন আহমদ, আহমেদ কবীর চৌধুরী, মনোরঞ্জন ধর, আহমেদ হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, কক্সবাজারের এমএলএ কবির আহমদ চৌধুরী অন্যতম।১৯
২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকায় রক্তপাতের খবর পেয়ে দীর্ঘ মেয়াদী জ্বরে আক্রান্ত সাহিত্যিক ও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মাহবুব উল আলম চৌধুরীকে ছাত্র ফেডারেশন কর্মী ননী ধর এর সহায়তায় ‘কাঁদতে আসেনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতা রচনা করেন। এ কবিতাটি বাংলার ভাষা আন্দোলনের উপর প্রথম রচিত কবিতা। কবিতাটি কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস থেকে ছেপে বের করা হয় বিলি করতে। কিন্তু সরকার কবিতটি নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করায় গোপনে রাতারাতি ছাপিয়ে প্রেস ম্যানেজার কম্পোজিটার ও মেশিনম্যানরা জনগণের ক্ষোভের বাস্তবরূপ দান করে। কবিতাটি প্রকাশ করার দায়ে কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস বন্ধ করার আদেশ এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি দবির উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান সরকার। বিচারে তার ৬ বছর সশ্রম কারাদ-ের পর মুক্তি পান।
রাষ্ট্রভাষা বাঙলার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি এবং ছাত্র নিহত ঘটনার খবরটি প্রথম কক্সবাজারে আসে টেলিফোনের মাধ্যমে কক্সবাজার মহকুমা প্রশাসক মৌলভী গফুরুজ্জামান চৌধুরীর বাসায়। ওই টেলিফোন সেটের একটি সংযোগ ছিল কক্সবাজার সিএ-বির প্রকৌশলী এস আর খানের বাসায়। সেই সুবাদে মহকুমা প্রশাসকের সাথে এ সম্পর্কিত বিষয়ে এস আর খান আলাপ করার সময় তার ভাগিনা কক্সবাজার ইংরেজি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র খালেদ মোশাররফ (পরবর্তীতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, কে ফোর্সের অধিনায়ক এবং স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের সেনা প্রধান) শুনে ফেলেন। তিনি যথারিতি ২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার (ওই সময় সাপ্তাহিক ছুটি ছিল রবিবার) স্কুলে গিয়ে তার সহপাঠী ও স্কুলের ছাত্রদের জানালে ছাত্রদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সকাল ১০টার দিকে খালেদ মোশাররফ ও একই ক্লাসের ছাত্র আবদুল মাবুদ এখলাছী ও নুরুল হুদা চৌধুরী (স্বাধীনতার সময় মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং ক্যাপ্টেন ফরহাদ হত্যার নেতৃত্ব দেন) এর নেতৃত্বে ছাত্ররা কাস বর্জন করে নিহত ও রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। ১০ম শ্রেণির ছাত্র আবুল মাবুদ এখলাছী নিজের হাতে স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে বিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় মিছিলরত অবস্থায় গুলি করে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে মিছিলে অংশ গ্রহণ করার আহ্বান জানান। এ সময় ছাত্ররা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে মিছিল সহকারে কক্সবাজার শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাহারছড়ায় গিয়ে জনসভা করে। একটি ভাগের নেতৃত্ব দেন খালেদ মোশাররফ। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে মিছিলে অংশ নেন নুরুল হুদা চৌধুরী (বদরমোকাম), আকতারুজ্জামান চৌধুরী (তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মৌলভী গফুরুজ্জামান চৌধুরীর ছেলে), আবদুল মাবুদ এখলাছী (চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালত ও কক্সবাজার মহকুমা আদালতের আইনজীবী মৌলভী এখলাছুর রহমানের ছেলে), ৯ম শ্রেণির ছাত্র নুর আহমদ (এডভোকেট, সাবেক এমএনএ), এস এম রফিক উল্লাহ (বড় মহেশখালী), শামসুল হুদা (পেতাসওদাগর পাড়া), ওসমান গণি (মহেশখালী), জালাল আহমদ (নতুন বাহারছড়া), আবদুর রহমান (টেকপাড়া), টেকপাড়ার কামাল উদ্দিন, প্রভাস রক্ষিত, নিখিলেশ্বর চক্রবর্তী (অগ্নিযুগের বিপ্লবী জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তীর ছেলে এবং চট্টগ্রাম ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের নেতৃত্বকারী শহীদ শৈলেশ্বর চক্রবর্তীর ভাইপো, বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী), নাসির উদ্দিন (তৎকালিন কক্সবাজার রেঞ্জ অফিসারের ছেলে) প্রমুখ। কক্সবাজার হাই স্কুলের ছাত্র সালামত উল্লাহ (১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় ঘৃণিত হন এবং কক্সবাজার মহকুমা শান্তি কমিটির অফিস সেক্রেটারী ছিলেন) ও আমিরুল কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৫০-২০০ জন ছাত্রের অপর দলটি দক্ষিণ বাহারছড়া হয়ে প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ এবং পথে সভার আয়োজন করে। এ মিছিল ও সমাবেশে আবদুল কাদের (পরবর্তীতে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক), মোহাম্মদ মুসলিম, আবুল কাসেম (পরবর্তীতে লাইন্সম্যান), জয়নাল আবেদিন (বাহারছড়া), সগীর আহমদ (নুনিয়ারছড়া), মোজাম্মেল হক (খুরুস্্কুল), ওয়াহিদুল আলম (টেকপাড়া), মোস্তাক আহমদ (টেকপাড়া), গুরা মিয়া (তহসিলদার, চৌফলদন্ডী), গোলাম আহমদ (বাহারছড়া), আলতাজ আহমদ (কস্তুরাঘাট)সহ আরো অনেকে অংশ নেন।২০
খালেদ মোশাররফ এর নেতৃত্বে ২০-৩০ জন ছাত্রের এ দলটি একটি মিছিল নিয়ে বাহারছড়ায় গিয়ে সালামত উল্লাহ ও আমিরুল কবির চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন সভায় মিলিত হন। উক্ত সভাস্থল থেকে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে তারা সি.এ্যান্ড. বি.এর জনৈক ঠিকাদারকে একটি ট্রাক যোগাড় করে দেয়ার অনুরোধ করলে তিনি একটি ট্রাক যোগাড় করে দেন। এই ট্রাক নিয়ে ছাত্ররা ‘রক্তের বদলা রক্ত চাই’, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ প্রভৃতি সেøাগান সহকারে কক্সবাজার শহর প্রদক্ষিণ করার পর আবদুল মাবুদ এখলাছী, আখতারুজ্জামান চৌধুরী, নিখিলেশ্বর চক্রবর্তী, আমিরুল কবির চৌধুরী, জালাল আহমদসহ ১৫/১৬ জনের একটি দল ওই ট্রাকে করে রামু হয়ে, ঈদগাঁও হয়ে চকরিয়া পর্যন্ত ট্রাক মিছিল করে। ট্রাক মিছিলেও চলে সেøাগান। ট্রাকটি চকরিয়া গিয়ে মৌলভীর কুমের কাছে গিয়ে আবার কক্সবাজার ফিরে আসে। মাতামুহুরী নদীর ভাঙ্গনের ফলে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে আর উত্তর দিকে তথা চকরিয়া হাই স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ট্রাক মিছিল করে ফিরে এসে তারা শহরের লালদিঘির পাড়ের আহমদ সওদাগরের হোটেলে বসে ভাত খেয়ে যার যার বাড়ি চলে যান। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মৌলভী গফুরুজ্জামান চৌধুরী রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে থাকায় ওই সকল মিছিল-সমাবেশে পুলিশ তথা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার বাধা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ওই সময়ের ভাষা সৈনিকবৃন্দ। ওই দিন (২২ ফেব্রুয়ারি) বর্তমানে যেখানে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অবস্থিত সেখানে একটি অনির্ধারিত সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি খুনী নুরুল আমিনের বিচার চাই, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’সহ বিভিন্ন সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত করে কক্সবাজার শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ পূর্বক কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরিতে এক জনসভায় মিলিত হন ছাত্ররা। খালেদ মোশাররফের আত্মীয় আইয়ুব আলীর সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ১০ম শ্রেণির ছাত্র খালেদ মোশাররফ, আবদুল মাবুদ এখলাছি, আকতারুজ্জামান চৌধুরী, কামাল উদ্দিন, ৮ম শ্রেণির ছাত্র আমিরুল কবির চৌধুরী, নুরুল হুদা চৌধুরী, আবদুল কাদের, সালামত উল্লাহ (এডভোকেট), আবদুর রহমান (টেকপাড়া), নিখিলেশ্বর চক্রবর্তী, শামসুল হুদা (ঝিলংজা), ওসমান গণি (মহেশখালী), আবুল কাসেম, নুনিয়াছড়ার সগীর আহমদ, বাহারছড়ার জয়নাল আবেদিন প্রমুখ।২১ পরবর্তী দিক নির্দেশনার জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল চারটায় কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে খালেদ মোশাররফ, তৎকালিন মহকুমা প্রশাসক মৌলভী গফরুজ্জামান চৌধুরীর ছেলে আখতারুজ্জামান চৌধুরী, নাসির উদ্দিন, আমিরুল কবির চৌধুরী, নুরুল হুদা চৌধুরী প্রমুখ ছাত্রবৃন্দ সমবেত হন। কিন্তু গোয়েন্দা দারোগা আবদুল আউয়াল সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়ে বাধা প্রদান এবং তাদেরকে ধমকাতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে নূরুল হুদা চৌধুরীকে আটক করে। (যদিও পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়) ফলে সভাটি প- হয়ে যায়।২২
২৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নটি অমিমাংসিত রেখে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে ফের পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বক্তব্য এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার পুলিশ জন নিরাপত্তা আইনে এমএলএ মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, গোবিন্দ লাল ব্যানার্জি, মনোরঞ্জন ধর, অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের শেষ সাধারণ সম্পাদক, খেলাফত রাব্বানী পার্টির আবুল হাশিম, হামিদুল হক চৌধুরীসহ আটজনকে গ্রেফতার করার পর সারাদেশ উত্তাল হয়ে উঠে। সারাদেশের ন্যায় ২৪ ফেব্রুয়ারি ও ২৫ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের সর্বত্র হরতাল পালিত হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকালে কক্সবাজারে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে আরো জোরদার করতে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে তথা ১৯৪৮ সালের ৬ জানুয়ারি বাংলার দাবিতে সরকারি থেকে পদত্যাগকৃত অধ্যাপক ও সাবেক ডাকসু ভিপি ফরিদ আহমদ এর নেতৃত্বে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় অগ্নিযুগের বিপ্লবী সুরেশ সেন (১৯০৫-১৯৮১), এডভোকেট জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তী (১৯০৬-১৯৯৯) প্রমুখের উপস্থিতিতে ২৭ ফেব্রুয়ারি রুমালিয়ারছড়া এক জন সমাবেশের সিদ্ধান্ত এবং সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি আহুত ৫ মার্চ শহিদ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৫ মার্চের জনসভা সফল করতে খালেদ মোশাররফ, পাকিস্তান ন্যাশনাল গার্ড সালারে আওয়াল আবদুল হামিদ খান, আফসার কামাল চৌধুরী, আমিরুল কবির চৌধুরী, নুরুল হুদা চৌধুরীসহ ছাত্র জনতা ব্যাপক প্রচারণা চালায়। রামুতে মিছিলোত্তর এক জনসভা হয়। আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা আফসার কামাল চৌধুরী (১৯২৫-১৯৯২)র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জাকের আহমদ, মোশতাক আহমদ, ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী, মন্মথ বড়–য়া, মনির আহমদ, নিউথু মং, থাংলাগ্য, আবুল কাশেম, গর্জনিয়ার রশিদ আহমদ চৌধুরী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন এবং সভায় অচিরেই ছাত্র হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি রুমালিয়ারছড়ায় ফরিদ আহমদ (পরবর্তীতে মৌলভী ফরিদ আহমদ নামে পরিচিত, ওই সময় ফরিদ আহমদ কক্সবাজার কোর্টে ওকালতি করতেন) এর সভাপতিত্বে এক প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে খালেদ মোশাররফ, আবদুল মাবুদ এখলাছি, আমিরুল কবির চৌধুরী, সালামত উল্লাহ, নুরুল আজিম চৌধুরী, সিরাজ আহমদ নাজির, নুরুল হুদা চৌধুরীর নেতৃত্বে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রুমালিয়ারছড়াস্থ জনসভায় অংশ নেন। সভায় বক্তব্য রাখেন এডভোকেট সুরেশ সেন, এডভোকেট জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তী, ক্রীড়াবিদ বদিউল আলম প্রকাশ বদু মাস্টার, সিরাজ আহমদ, ওবাইদুল হাকিম, অমরেন্দু মজুমদার, মনতোষ কুমার চৌধুরী, এডভোকেট মোহাম্মদ আলী প্রমুখ।২৩ওই সভা থেকে মিছিল সহকারে রামু চৌমুহনীতে জন সমাবেশে গিয়ে মিলিত হন।
ঢাকা সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির ডাকা ৫ মার্চ শহিদ দিবস সারাদেশের ন্যায় কক্সবাজারে পালিত হয়। ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে খতমে কোরআন, ছাত্র ধর্মঘট, সব দোকান পাট বন্ধ, কোর্ট-অফিস বন্ধ ছিল সেই দিন। কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয়, চকরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, রামু খিজারী বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রধর্মঘট পালনের পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে মিছিল করে। কক্সবাজার শহরে কাছারী পাহাড়ে ১৯৩০ সালে সংঘটিত চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ ও জালালাবাদ যুদ্ধের সাহসী সৈনিক সুরেশ সেন, মৌলভী ফরিদ আহমদ, আয়ুব আলী, বদিউল আলম প্রকাশ বদু মাস্টারের পরামর্শে ছাত্র নেতা খালেদ মোশাররফ, আবদুল মাবুদ এখলাছি, আমিরুল কবির চৌধুরী এর নেতৃত্ব এক প্রতিবাদী মিছিল নিয়ে কাছারী পাহাড়ে হাজারো ছাত্র জনতার সমাবেশ হয়। ওই সমাবেশে সরকারি দমন পীড়নের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ জানোনা হয়। মো. আইয়ুব আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সুরেশ সেন, জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তী, ফরিদ আহমদ, ওবাইদুল হাকিম, খালেদ মোশাররফ, আবদুল হামিদ খান, আবদুল মাবুদ এখলাছী, সগীর আহমদ, জয়নাল আবেদীন প্রমুখ। সভায় প্রদেশের অফিস আদালতের ভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ, গুলিবর্ষণের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচার এবং ভাষা আন্দোলনে ধৃত ব্যক্তিদের মুক্তির দাবি তোলা হয় এবং সভা শেষে কক্সবাজার কাছারী পাহাড় থেকে কস্তুরাঘাট, কাছারী পাহাড় থেকে বাজারঘাটা, বাজারঘাটা থেকে সী-বিচ পর্যন্ত তিনটি সড়কের নাম সালাম, জাব্বার ও বরকতের নামে নামকরণ করা হয়েছিল বলে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কক্সবাজার’ নামক এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন ভাষাসৈনিক বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী।
তন্মধ্যে বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা সরণীটি দীর্ঘদিন বেসরকারিভাবে শহিদ ছালাম রোড নামে পরিচিত ছিল। অন্যান্য নামের ফলকগুলো পুলিশ তুলে ফেলেছিল। কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে বিশেষ করে সংস্কৃত প-িত শ্রী দেবপ্রসাদ চৌধুরী ছাত্রদেরকে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। এ সমস্ত কর্মকা-ে সাধারণ মানুষের প্রচুর সহানুভূতি ও সহযোগিতা ছিল।
আমিরুল কবির চৌধুরী রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে কক্সবাজারে আমাদের আন্দোলন চলাকালে ঢাকা থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন সংবাদ নিয়ে আমি চিঠি পাঠাতাম রামু স্কুলের ছাত্র নেতৃবৃন্দের কাছে। সর্ব বিষয়ে আমাদের পরামর্শ দিতেন জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তী এডভোকেট, বদিউল আলম মাস্টার প্রমুখ। কক্সবাজার থাকাকালে ১৯৫৩ ও ১৯৫৪ সালে প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে সকলের জন্য কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিলের ব্যবস্থা করতাম।’
কক্সবাজার সদর উপজেলার ঈদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে ও একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ২৪ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়ে ধর্মঘট করে। প্রায় ৮০/৯০ জন ছাত্রের একটি মিছিল ঈদগাঁও এলাকা প্রদক্ষিণ করে জনগণকে ভাষা চেতনায় জাগ্রত করে। ‘ছাত্রহত্যার বিচার চাই, নূরুল আমিনের ফাঁসি চাই’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতো দেবো না; ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই, ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ প্রমুখ সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত করে এবং এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র হত্যাসহ রাষ্ট্রীয় জুলুমের প্রতিবাদ এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতি না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করা হয় ওই সভা থেকে। এই মিছিলের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন মুসলিম ছাত্র লীগের মহকুমা নেতা নূরুল আজিম চৌধুরী (জোয়ারিয়ানালা ইউপি চেয়ারম্যান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষালম্বন করায় ঘৃণিত হন), ছিদ্দিক আহমদ খালভী (পরবর্তীতে পোকখালী ইউপি চেয়ারম্যান) ও সুলতানুল আলম চৌধুরী। মিছিলে অংশ নেন বিদ্যালয় ছাত্র নজরুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশ লেদু মিয়া, গোপাল ভট্টাচার্য (ঈদগাঁও), রাখাল ভট্টাচার্য্য (বর্তমানে কানাডা প্রবাসী), ছৈয়দ নূর ফরাজী (বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা), মোহাম্মদ ইব্রাহিম (বাংলা একাডেমির প্রয়াত পরিচালক), মথুরা বিকাশ পাল (পরবর্তীতে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক, কক্সবাজার সরকারি কলেজ), কেদারেশ্বর ভট্টাচার্য্য, মোজাফফর আহমদ (পরবর্তীতে ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য), ছৈয়দুল আলম চৌধুরী (১৯৩৭-২০০৩, পরবর্তীতে ডুলাহাজারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত), সুলতানুল আলম চৌধুরী (পরবর্তীতে ঈদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক), বদিউল আলম (পরবর্তীতে কক্সবাজার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সভাপতি) প্রমুখ ছাত্রবৃন্দ। চকরিয়া উপজেলার হারবাং এলাকার আবদুল হামিদ খান স্কুলের প্রধান শিক্ষক, প্রাক্তন ওসি এবং পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে নেতৃত্বের গুণাবলি এবং মানুষের মন জয় করার অধিকারী হওয়ায় তিনি এ ব্যাপারে ছাত্রদেরকে যথেষ্ট সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন এবং তিনি নিজেও ভাষা আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন।
মহকুমার প্রবেশদ্বার উপজেলা হিসেবে পরিচিত চকরিয়ায় যে কোনো আন্দোলনে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমএলএ) তমদ্দুন মসলিস নেতা কবির আহমদ চৌধুরী (পেকুয়া) কক্সবাজার মহকুমার প্রতিনিধিত্ব করতেন। রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনে চট্টগ্রাম ও চকরিয়ায় সবকটি কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছেন। পূর্ববাংলা ব্যবস্থা পরিষদের মুসলিম ও কংগ্রেস দলীয় যে ১২ জন সদস্য ওয়াকআউট করেন তার মধ্যে কক্সবাজারের এমএলএ কবির আহমদ চৌধুরীও ছিলেন। ভাষার প্রশ্নে তার ওয়াক আউট ছিলো এ এলাকার ছাত্র সমাজের জন্য নিয়ামক শক্তি। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার প্রথম খবর চকরিয়া পৌঁছে ২২ ফেব্রুয়ারি।
২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের গুলি এবং ছাত্র হত্যা ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ২২ ফেব্রুয়ারি চকরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র এস কে শামসুল হুদা, ৯ম শ্রেণির ছাত্র জামাল উদ্দীন আহমদ (পরবর্তীতে রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক এবং চকরিয়া ডায়াবেটিক হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা) প্রমুখের নেতৃত্বে ক্লাস বর্জনপূর্বক বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে মিছিল সহকারে থানা সদরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে। এই মিছিলে অন্তত ২০০-২৫০ ছাত্র অংশগ্রহণ করেছিলো। মিছিল শেষে নিকটস্থ ডাকবাংলো মাঠে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্ররা মিছিলে ‘ছাত্রহত্যার বিচার চাই, নূরুল আমিনের ফাঁসি চাই’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতো দেবো না’, ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই, ছাত্র হত্যার বিচার চাই’―এসব সেøাগান দেয়। এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা হলেন, ১০ম শ্রেণির ফাস্টবয় শাহনওয়াজ আহমদ জাহাঙ্গীর (পরবর্তীতে কক্সবাজার হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক, এডভোকেট এবং কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা), এস কে শামসুল হুদা (পরবর্তীতে চকরিয়া থানা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ছিলেন) সিরাজ উদ্দীন রেজা (শিক্ষক), মোহাম্মদ ইসহাক, নাসির আব্বাস, আমান উল্লাহ, হাবিব উল্লাহ, নাসির উদ্দীন রেজা, মোসলিম উদ্দীন রেজা (পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক, নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম), আনোয়ার হোসেন (পরবর্তীতে ঠিকাদার ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক), রাজা মিয়া (জমিদার মোশতাক আহমদ চৌধুরী পরিবারের সদস্য), কাকারার মাহবুব, ছালামত উল্লাহ, মাহবুব হোসেন, এম. এ গণি (পরবর্তীতে রাজনীতিবিদ), নজির আহমদ (পরবর্তীতে ব্যুরো প্রধান বাসস, চট্টগ্রাম প্রমুখ) এনামুল হক, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, আবদুস সালাম (প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে অরসরপ্রাপ্ত), মোহাম্মদ সাকের আহমদ (পরবর্তীতে মাস্টার) প্রমুখ। এ ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক জগবন্ধু বড়–য়া (চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার বাণীগ্রাম এলাকার বাসিন্দা) ছাত্রদেরকে ব্যাপক সহযোগিতা করেছিলেন।
ওই দিনের স্মৃতির কথা উল্লেখ করতে গিয়ে জামাল উদ্দিন আহমদ বলেন, কক্সবাজার হাই স্কুল থেকে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বকারী খালেদ মোশাররফ এর নেতৃত্বে জালাল আহমদ, নুরুল হুদা চৌধুরী, এডভোকেট সালামাত উল্লাহ, আমিরুল কবির চৌধুরী, আখতারুজ্জামান চৌধুরী, নাসির উদ্দিনসহ ২০-৩০ জন ছাত্রের এ দলটি সি.এ্যান্ড.বি.এর জনৈক ঠিকাদারকে একটি ট্রাক যোগাড় করে দেয়ার অনুরোধ করলে তিনি একটি ট্রাক যোগাড় করে দেন। এই ট্রাক নিয়ে ছাত্ররা ‘রক্তের বদলা রক্ত চাই’, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ প্রভৃতি সেøাগান সহকারে কক্সবাজার শহরে প্রদক্ষিণ করার পর রামু, ঈদগাঁও হয়ে চকরিয়া আসেন বিকেল ৩-৪টার দিকে। উনারা আসলে চকরিয়া হাই স্কুল মাঠে অবস্থানরত ছাত্রদের নিয়ে আমরা মিছিল সহকারে তাদেরকে স্বাগত জানাই এবং তাদের সাথে মিছিলে মিলিত হয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি জানাই। মিছিলোত্তর সমাবেশে খালেদ মোশাররফ, নুরুল হুদা চৌধুরী, ছালামত উল্লাহ, শাহনেওয়াজ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, সিরাজ উদ্দিন রেজা, জামাল উদ্দিন আহমদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। পরে সন্ধ্যায় পুনরায় তারা কক্সবাজারে ফিরে যায়। ২৪
এছাড়া চকরিয়া উপজেলার আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতা আজিজুর রহমান (প্রকাশ লাল আজিজ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পিডিপিতে যোগদান করে নির্বাচন করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন চকরিয়া শান্তি কমিটির অন্যতম সদস্য গ্রহণ করে বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান করায় ঘৃণিত হন) ওই সময় তমদ্দুন মজলিস চট্টগ্রাম শাখার একজন সদস্য হিসেবে চট্টগ্রাম, পটিয়া, সাতকানিয়া, হাতিয়া, নাজিরহাট, চকরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষা বিষয়ক বিভিন্ন আন্দোলন, সেমিনার ও সমাবেশে সক্রিয় অবদান রাখতেন।
পেকুয়া জিএমসি ইন্সটিউিটের ছাত্ররাও রাজধানী ঢাকায় একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে ২২ বা ২৩ ফেব্রুয়ারি বিক্ষোভ মিছিল, বিক্ষোভ সমাবেশ, ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। এ খবরটি জানার পর পেকুয়ার জমিদার আবদুল আজিজ চৌধুরীর ছেলে মাহমুদুল করিম চৌধুরী (১৯৩৮-২০০৬)সহ অন্যান্য ছাত্ররা পেকুয়া জিএমসি ইনস্টিটিউটে ক্লাস বর্জনপূর্বক মিছিল নিয়ে বের হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বীকৃতি এবং ছাত্রহত্যার নিন্দা ও বিচার দাবি জানানো হয় ওই মিছিল-সমাবেশে। পেকুয়া জিএমসি ইনস্টিটিউটের ৮ম শ্রেণির ছাত্র মাহমুদুল করিম চৌধুরী জমিদারপুত্র হওয়ায় তারই নেতৃত্বে শুরু হওয়া ছাত্র ধর্মঘটে অংশ নেন ওই স্কুলের ছাত্র জহিরুল ইসলাম চৌধুরী, কামরুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশ কামাল চৌধুরী, আবুল কাসেম চৌধুরী (বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা জিএম চৌধুরীর দৌহিত্র), ওই স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র এবং ছাত্র মনিটরের এজিএস এম এ শুকুর (পরবর্তীতে টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও উখিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক), আবুল বশর (এডভোকেট, সদ্য প্রয়াত), আবদুল মজিদ (অধ্যক্ষ, পাহাড়তলী কলেজ, চট্টগ্রাম), মোহাম্মদ ইদ্রিস প্রমুখ।
এম এ শুকুর স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। তিনি স্কুলের এজিএস ছিলেন। একই সাথে তিনি নিখিল পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত ছিলেন। ভাষা আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৫২ সালে আমি অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হই। আমার সহপাঠিদের মধ্যে ছিলেন মাহমুদুল করিম চৌধুরী (সাবেক সাংসদ), আবদুল মজিদ, মোহাম্মদ ইদ্রিস, কামরুল ইসলাম চৌধুরী প্রকাশ কামাল চৌধুরী, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাসেম চৌধুরী (বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা গোরা মিয়া চৌধুরী প্রকাশ জিএম চৌধুরীর দৌহিত্র এবং এমএলএ কবির আহমদ চৌধুরীর ছেলে)। ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভাষার দাবিতে আন্দোলন করে। ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ গুলি ছুঁড়লে অনেক ছাত্র শহিদ হয়। এ খবর একদিন কি দুইদিন পরে অর্থাৎ ২২ বা ২৩ ফেব্রুয়ারি পেকুয়া জিএমসি ইন্সটিটিউটে এসে পৌঁছে। খবর পেকুয়া এসে পৌঁছার সাথে সাথেই আমরা ক্লাশ থেকে বেরিয়ে পড়ি। আমাদের সহপাঠি মাহমুদুল হক চৌধুরী এলাকার জমিদারের ছেলে। জমিদারের ছেলে হিসেবে তার নেতৃত্ব দেওয়ার দক্ষতা ছিলো। মাহমুদুল করিম চৌধুরী পূর্ব থেকেই বাম রাজনীতির সাথে পরিচিত ও জড়িত ছিলেন। ফলে মাহমুদুল করিম চৌধুরীসহ আমরা স্কুলের মাঠে সমবেত হই। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে আমরা বিদ্যালয় মাঠেই সমাবেশ করি এবং এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। সমাবেশে অনেকেই বক্তব্য প্রদান করেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় এক মাইল ও পশ্চিম দিকে পেকুয়া বাজার পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে আবার স্কুলে ফিরে আসি। ‘ছাত্রহত্যার বিচার চাই, নূরুল আমিনের ফাঁসি চাই’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতো দেবো না’, ‘মাতৃভাষা বাংলা চাই, ছাত্র হত্যার বিচার চাই’ সেøাগান দিয়ে পর পর দুইদিন আমরা ছাত্রদের নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করি। দুই দিন ধরে স্কুলের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ ছিলো। এসময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি এলাকার আনোয়ারুল আজিম চৌধুরী। স্কুলের কোনো শিক্ষকই ছাত্রদের বিক্ষোভ সমাবেশে বাধা প্রদান করেননি। শিক্ষকদের মৌন সমর্থন না থাকলে আমরা বিদ্যালয় থেকে বের হতে পারতাম না, ছাত্রদের নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ করতে পারতাম না, পারতাম না বিক্ষোভ মিছিল করতে। যদিও এলাকার দু’একজন শিক্ষিত লোকজন আমাদের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ নিয়ে নাক ছিটকায়। তবে তাদেরকে আমরা আমলে নিই নি।’ ২৫
কুতুবদিয়া উপজেলা চট্টগ্রাম শহরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র হত্যার খবরটি কুতুবদিয়ায় পৌঁছায় ২২ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন চট্টগ্রাম থেকে আসা এ কে খান স্টিমার থেকে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার মাধ্যমে এ খবরটি পায়। তৎক্ষনাৎ ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে কুতুবদিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে কুতুবদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও ধুরং হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা। কুতুবদিয়া হাই স্কুলের ৯ম শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম (বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা ও দৈনিক কক্সবাজারের সম্পাদক) জানিয়েছেন এ তথ্য।
তিনি সেই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে একান্ত এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের মতো বড়ঘোপ স্টীমার ঘাটে গিয়ে চট্টগ্রাম থেকে আসা এ কে খান স্টীমারে গিয়ে তখনকার সাপ্তাহিক ইত্তেফাক (পরবর্তীতে দৈনিক ইত্তেফাক) আনতে গিয়ে ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির মিছিলে পুলিশের গুলি ও ছাত্র হত্যার খবরটি দেখা মাত্র কুতুবদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে স্কুলের বড় ভাই এবং সহপাঠী বন্ধুদের বলি এবং তাদের সম্মতিতে আমি নিজেই স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করে মিছিলে যোগদান করার আহ্বান জানাই ছাত্রদেরকে। ১০ম শ্রেণির ছাত্র এস কে মকবুল আহমদ, শামসুল হুদা সিদ্দিকী, সিরাজুল ইসলাম ও আমার নেতৃত্বে স্কুলের ছাত্ররা খরবটি লুফে নিয়ে প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী কুতুবদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, ‘খুনী আমিনের ফাসী চাই’ সেøাগানে সেøাগানে বের হয়ে বর্তমানের থানা কম্পাউন্টসহ সড়ক প্রদক্ষিণ করে কুতুবদিয়া হাই স্কুলের সমবেত হই। এ দিকে ধুরং হাই স্কুলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রমিজ উদ্দিন আহমদ এর নেতৃত্বে অর্ধ শতাধিক শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে মিছিল নিয়ে আমাদের হাই স্কুলের সামনে সমবেত হয়। পরে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন এস কে মকবুল আহমদ, ৯ম শ্রেণির ফাস্ট বয় মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, আমি মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, ধুরং হাই স্কুলের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রমিজ উদ্দিন আহমদ, (পরবর্তীতে ধুরুং হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালীন কুতুবদিয়ায় সংঘটিত ঘটনায় পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহী মামলার ২০ নং আসামী), মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী, শামসুল হুদা সিদ্দিকী, ছালেহ আহমদ চৌধুরী (প্রাক্তন চেয়ারম্যান) প্রমুখ। ওই সমাবেশে ছাত্র হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করা হয়। ওই সময় কুতুবদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জালাল আহমদ চৌধুরী (১৯১৮-১৯৮৯) যথেষ্ট সহায়তা করেন বলে জানান তিনি। ২৬
ওই মিছিল ও সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন, এস কে মকবুল আহমদ, মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, রাখাল চন্দ্র নাথ, রেজা শাহ মোসলেম উদ্দিন চৌধুরী, শামসুল হুদা ছিদ্দিকী, মোসলেম খান (পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতা)। তবে প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আরো কয়েকটি পথসভাও হয়েছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে। ওই পথসভায় সকল ছাত্র হত্যার বিচার এবং বাংলাকে রাষ্টভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার জোর দাবি জানানো হয়।
ওই সময় ‘আউলিয়ার দেশ কুতুবদিয়া’ গ্রন্থের প্রণেতা রশিদ আহমদ (১৯২০-?) ধুরং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বাংলার দাবিতে মিছিল-সমাবেশে যথেষ্ট সহায়তা করেন। তাছাড়া তিনি ১৯৪৭ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও, ঢাকা স্টেশনে প্রোগ্রাম সেক্রেটারী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৮ সালে মৌলভী ফরিদ আহমদের প্রভাবে সরকারি চাকুরিতে ইস্তফা দিয়ে নিজ থানা কুতুবদিয়ায় ফেরত আসেন বলে ইতিহাস পাঠে জানা যায়।
ওই সময় পুর্ব বঙ্গ ছাত্র ফেড়ারেশন, কৃষক সভা এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগ নেতা কবি ধীরেন শীলও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভাষার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। যিনি পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতা দেয়ার জন্য ৫৮ দিন জেলে অনশন করেছিলেন। এ তথ্য সরদার ফজলুল করিমের ‘অনশনে আত্মদান’ বইয়ে উল্লেখ আছে।
ঢাকায় ভাষা আন্দোলনের মিছিলে গুলি, ছাত্র হত্যার খবরটি রামুতে পৌঁছে ২৩ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন রামু খিজারী হাই স্কুলের অস্টম শ্রেণির ছাত্র প্রতিনিধি মোশতাক আহমদ (প্রফেসর) এর নিকট চিঠি দেন কক্সবাজারের সালামত উল্লাহ ও আমিরুল কবির চৌধুরী।২৭ চিঠির নিদের্শ মতে মোশতাক আহমদ ছাত্রদেরকে একত্রিত করে। ঢাকার ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে এবং ভাষার দাবিতে ছাত্ররা স্কুলে ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৫০-২০০ ছাত্রের একটি মিছিল রামুর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এই মিছিলে জাকের আহমদ (গর্জনিয়া), মোশতাক আহমদ, ফজলুল করিম (পরবর্তীতে প্রধান শিক্ষক ও ভারুয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান), অনমদর্শী বড়–য়া (লন্ডন প্রবাসী), ওবাইদুল হক (১৯৩২-২০০৭), ওসমান সরওয়ার আলম চৌধুরী (১৯৩৭-২০১০), মনির আহমদ, মন্মথ বড়–য়া (পরবর্তীতে বৌদ্ধ নেতা ও সাংবাদিক), নিউথু মং, থাংলাগ্য, ক্যাথিন প্রমুখ ছাত্র অংশগ্রহণ করে। এই মিছিলে সাধারণ জনগণের মৌন সমর্থন লক্ষ্য করা যায়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে জ্ঞানেন্দ্র বিকাশ বড়–য়া, নরেন্দ্র দস্তিদার (বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের ভাই), আবুল কাশেম মাস্টার (খুরস্কুল, ১৯৭০ সালে কক্সবাজার মহেশখালী প্রাদেশিক আসনে জামায়াতের মনোনিত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে হেরে যান) ছাত্রদেরকে প্রগতিশীল ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করেন। আবুল কাসেম ১৯৫২ সালে দক্ষিণ মিঠাছড়ি জুনিয়র হাইস্কুলের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে রামু খিজারী হাইস্কুলে যোগদান করেন। মিঠাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক থাকাকালীন আবুল কাশেম ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের উপর বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে ‘দৈনিক আযাদ’ পত্রিকার সম্পাদক ও এম, এল, এ আবুল কালাম শামশুদ্দীন পার্লামেন্ট থেকে পদত্যাগ করায় তাকে টেলিগ্রাম মারফত একটি অভিনন্দন বার্তা প্রেরণ করেছিলেন বলে ইতিহাস পাঠে জানা যায়।
কক্সবাজার জেলার দক্ষিণের উপজেলা উখিয়া ও টেকনাফ। সর্বদক্ষিণের উপজেলা টেকনাফে ১৯৫২ সালে কোনো উচ্চ বিদ্যালয় ছিলো না। টেকনাফে তখন ছিলো মাত্র একটি এম ই বিদ্যালয়। তাও খুব বেশি সুবিধের ছিলো না। এছাড়া দক্ষিণের অপর উপজেলা উখিয়া। উখিয়া সদরে তখন উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উখিয়া উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট কোটবাজার (রতœাপালং) এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো পালং মডেল উচ্চ বিদ্যালয়। পালং মডেল উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৭ সালে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনের ঢেউ কক্সবাজার মহকুমার দক্ষিণের উপজেলা উখিয়ার পালং মডেল হাই স্কুলেও এসে আছড়ে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মিছিলে গুলিতে ছাত্র হত্যার খবরটি ওই দিন রাত্রেই রেডিও এর মাধ্যমে খবর পায় পালং উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ২২ ফেব্রুয়ারি উখিয়ায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে তৎকালীন উখিয়া টেকনাফের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয় পালং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
রাজধানী ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির মিছিলে খুনী নুরুল আমিন সরকারের নির্দেশে গুলি করে ছাত্র হত্যার খবরটি ওই দিন রাত্রে পেয়ে যায়। ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতিদিনের মতো পালং উচ্চ বিদ্যালয়ে এসে স্কুলের সহপাঠী বন্ধুদের সাথে আলাপ তৎক্ষনাৎ ক্লাস বর্জন করে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে মিছিল ও উখিয়া থানা ঘেরাও করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাদশা মিয়া চৌধুরী ও স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র মোহাম্মদ জকরিয়া (শিক্ষক, বর্তমানে প্রয়াত) এর নেতৃত্বে পালং হাই স্কুলের শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে মিছিল সহকারে আরাকান সড়ক হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সেøাগান দিতে দিতে পায়ে হেঁটে উখিয়া থানা স্টেশনে যায়। এক পর্যায়ে উখিয়া থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদেরকে বলা হয় যে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলার সমর্থনে আপনারা আপনাদের কার্যক্রম বন্ধ করে আমাদের আন্দোলনকে সমর্থন করুন। নতুবা থানা উড়িয়ে দেয়া হবে’। পরক্ষণে থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্যরা আমাদের সমর্থন জানালেও উখিয়া স্টেশন ঘুরে এসে দেখি থানার পুলিশ তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ অবস্থায় আমরা থানায় গিয়ে লাঠি মেরে দরজা বন্ধ করি। অসংখ্য লাঠির আঘাতে থানার দরজা ফাটল হয়ে যায়।’ দীর্ঘদিন যাবৎ উক্ত ফাটল দরজা ভাষা আন্দোলনের আলামত হিসেবে বহাল ছিলো। তখন উখিয়া স্টেশনে জনতার উদ্দেশ্যে বাংলার ভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে ধারণা এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বাদশা মিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ জাকারিয়া, নিরোধবরণ বড়–য়া, প্রিয়দর্শী বড়ুয়া, ললিত বড়–য়া প্রমুখ। ওই সমাবেশে ছাত্র হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা করা হয়। ২৮
এছাড়া মিছিলে ছিলেন, ছালেহ আহমদ চৌধুরী (পরবর্তীতে কৃষক লীগ নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন চৌধুরীর পিতা), প্রিয়দর্শী বড়–য়া, এ কে আহমদ হোসেন (পরবর্তীতে এডভোকেট), আয়ুব আলী, রশিদ আহমদ, আজিজুর রহমান প্রকাশ আজিরান মিয়া (পরবর্তীতে এডভোকেট), তোফায়েল আহমদ চৌধুরী, ফরিদ আহমদ খোন্দকার (পরবর্তীতে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন), আবদুল হক চৌধুরী (পরবর্তীতে উখিয়া আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং উখিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক)সহ অনেকেই। সে সময় স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার কাননুগোপাড়া নিবাসী লোকনাথ দে। ছাত্রদের ক্লাশ বর্জন, বিক্ষোভ মিছিল সমাবেশে শিক্ষকদের মৌন সম্মতি ছিলো।
কক্সবাজার মহকুমার সাথে উখিয়া-টেকনাফের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত থাকায় ঢাকায় ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের মৃত্যুর সংবাদ টেকনাফে পৌঁছে বেশ দেরিতে। ২৬ ফেব্রুয়ারী দৈনিক আজাদ পত্রিকার মাধ্যমে খবর পেয়ে টেকনাক এম.ই স্কুলের প্রধান শিক্ষক অবিনাশ চন্দ্র দে (প্রয়াত), মংনি রাখাইন(প্রয়াত), ছৈয়দুর রহমান (প্রয়াত পোস্ট-মাস্টার), মাস্টার আবদুর রবের উৎসাহে ও সহযোগিতায় ছাত্ররা সংগঠিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি টেকনাফ এম.ই বিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ক্লাস বর্জনপূর্বক মিছিল করে টেকনাফ স্টেশন প্রদক্ষিণ করে। এ মিছিলে আলী আহমদ সওদাগর (টেকনাফ বাজার সমিতির নেতা), আবদুর রহমান, বাবু মংনি, আবদুল গণি (পরবর্তীতে টেকনাফ সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সদস্য এবং এরশাদ সরকারের আমলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত), ছালেহ আহমদ মাস্টার, জালাল উদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ মিয়া মেইকার, হোছেন আহমদ, নুরুজ্জামান, নুরুল হক (পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশায় জড়িত ছিলেন), আবদুল মোনাফ, বদিউর রহমান, বাবু সুব্রুত, আমির হামজা প্রমুখ ছাত্র অংশ নেন। ছাত্র মিছিলের উৎসাহ ও সহযোগিতা করার দায়ে ৩জন শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়। টেকনাফে ২ দিনে ২ টি ছাত্র মিছিলের পরপরই সরকারি দল মুসলিম লীগ নেতা নজির আহমদ চৌধুরী ও আবদুল গফুর চৌধুরীর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন নস্যাৎ করতে ৪টি সভা করে। সভায় নেতারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন এবং এ ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের কঠোর শাস্তির কথা উল্লেখ করেন। এ চারটি সভায় উপস্থিত উল্লেখ্যযোগ্যরা হলেন খান বাহাদুর ফজলুল কাদের চৌধুরী, মকসুদ আহমদ চৌধুরী, আনোয়ার চৌধুরী, মীর কাসেম চৌধুরী, জাফর আলম চৌধুরী( ১৯০৩-১৯৭৭), আবদুর গফুর চৌধুরী (১৯৩০-১৯৯০) নজির আহমদ চৌধুরী প্রমুখ। এরা প্রায় সকলেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অবলম্বন করে বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ভূমিকা পালন করেন।২৯
তাছাড়া কক্সবাজারের কৃতিসন্তান ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিটি আন্দোলনে শরীক হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্রী মাহফিল আরা আজমত (১৯২৯-১৯৯৩; তিনি অবিভক্ত বাঙলার জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন বিষয়ক মন্ত্রী খান বাহাদুর জালাল উদ্দিন আহমদ চৌধুরী (১৮৮১-১৯৫৭)’র ভাই কবির উদ্দিন চৌধুরীর মেয়ে)। তিনি ভাষা আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে মিটিং-মিছিলে অংশগ্রহণ ছাড়াও ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন লিখতেন এবং ছাত্রীদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন মর্মে খবর রটে যায়। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভাঙতে তিনি ছাত্রীদের সংগঠিত করার নেতৃত্ব দিয়েছেন অন্যদের সঙ্গে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী ডুলাহাজারার শাহাবুদ্দিন চৌধুরী (পরবর্তীতে চকরিয়া কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ও কক্সবাজার কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক)। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল থেকে পুলিশ শাহাবুদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করে। তিনি প্রায় এক সপ্তাহ জেল-হাজতে ছিলেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র মো. বদরুজ্জামান বায়ান্নর ভাষা দাবির মিছিলে অংশগ্রহণ করেন (১৯৩০-২০০৮) যার নেতৃত্বে ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে রামুতে জনসভা এবং মিছিল সমাবেশ হয়)। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কক্সবাজারের মতো মফস্বল এলাকার অবদান গৌরবদীপ্ত। কক্সবাজারের আন্দোলন ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো সহিংস না হলেও তা ছিল যথেষ্ট সুসংগঠিত ও জনসমর্থিত।
ভাষা আন্দোলনের সে উত্তাল দিনগুলোতে কক্সবাজারের ভূমিকাকে আঞ্চলিকতার দোহাই দিয়ে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার আক্রমণ, জালালাবাদ যুদ্ধে অংশ নেয়া ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম দুই বিপ্লবী এডভোকেট সুরেশ চন্দ্র সেন, জ্যোতিশ্বর চক্রবর্তী এবং ভাষা আন্দোলনের পক্ষে প্রথম সরকারি চাকুরিতে পদত্যাগকারী অধ্যাপক মৌলভী ফরিদ আহমদ কক্সবাজারের সন্তান ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর ১৯৫৫ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণ পরিষদ নির্বাচনে নেজাম ইসলামের পক্ষ থেকে মৌলভী ফরিদ আহমদ দ্বিতীয় বারের মতো গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকারেরর কাছ থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলাকে স্বীকৃতি আদায়কারীর অন্যতম জাতীয় পরিষদ সদস্য ছিলেন।
আমাদের মানতেই হবে ভাষা আন্দোলনের মহান সৈনিকরা ভাষার মর্যাদা বা সম্মান প্রতিষ্ঠা করলেও তাদের প্রকত উদ্দেশ্য আজো বাস্তবায়িত হয়নি। তাদের উদ্দেশ্য শুধু বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা ছিল না। ছিল এ ভাষাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও জীবন ধারার বিকাশও অবশ্যই। যতদিন না বাংলা সংস্কৃতি আর বাঙালির জীবনধারা শতদলে বিকশিত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত মহান ভাষাসৈনিকদের মর্যাদাও প্রতিষ্ঠিত হবে না, অন্তত পরিপূর্ণরূপে।
শহিদমিনারের কথা
শহিদমিনার ভাষা শহিদদের উদ্দেশে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনে নিহত শহিদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার উদ্দেশ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে এই স্তম্ভ নির্মিত হয়, যা বর্তমানে ‘শহিদমিনার’ নামে পরিচিত। এই শহিদমিনারে শহিদদের স্মৃতিই কেবল নয়, বেশ কয়েকবার ভাঙচুরের বেদনাও বিদ্যমান। ঢাকায় প্রথম শহিদমিনার নির্মিত হয় এ স্থানেই ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে। ১৯৫২ সালের ঘটনাবহুল ২১ এবং ২২ ফেব্রুয়ারির রেশ ধরে ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতেও কারফিউ বলবৎ ছিল ঢাকায়। পথে পথে ছিল সেনা প্রহরাও। তবু এরই মাঝে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে অবস্থানরত রাজনীতি সচেতন ছাত্ররা আকস্মিক ভাবে সিদ্ধান্ত নেয় ভাষা আন্দোলনে শহিদদের স্মরণে একটি মিনার নির্মাণের। সর্বসম্মতিক্রমে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র বদরুল আলম এই কলেজেরই আরেকজন ছাত্র সাইদ হায়দারের সহায়তায় প্রণয়ন করেন একটি মিনারের নকশা। সেই নকশা অনুযায়ী সেখানে উপস্থিত সর্বসাধারণের যৌথশ্রমে একরাতেই নির্মিত হয় প্রায় সাড়ে দশ ফুট উঁচু এবং ছয় ফুট চওড়া প্রথম শহিদমিনারটি।
পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি রবিবার, অনানুষ্ঠানিকভাবে মিনারটি উদ্ধোধন করেন ভাষা শহিদ শফিউর রহমানের পিতা। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে মিনারটি উদ্বোধন হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। মিনারের আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করেন দৈনিক আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন।
বর্তমান শহিদমিনারের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে শহিদদের রক্তভেজা স্থানে সাড়ে ১০ ফুট উঁচু এবং ৬ ফুট চওড়া ভিত্তির ওপর ছোট স্থাপত্যটির নির্মাণকাজ শেষ হলে এর গায়ে ‘শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ’ লেখা একটি ফলক লাগিয়ে দেওয়া হয়। নির্মাণের পরপরই এটি শহরবাসীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে; প্রতিবাদী আন্দোলনের প্রতীকী মর্যাদা লাভ করে। এখানে দলে দলে মানুষ এসে ভিড় জমায়। কিন্তু সেই উদ্বোধনের পর মিনারের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব এবং এর চেতনাবিকাশী শক্তির কথা দ্রুত অনুধাবন করে ওই দিনই বিকেলে পুলিশ হোস্টেল ঘেরাও করে গুড়িয়ে দেয় বাঙালির প্রাণের আবেগজড়িত মিনারটি। ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসে ৯ মে’র অধিবেশনে একুশ দফার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শহিদমিনার তৈরি, একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে বটে, কিন্তু ওই বছর ৩০ মে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় তা আইনসিদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মানুষ কালো কাপড়ে ঘিরে রাখে স্মৃতির মিনারের বিদীর্ণ স্থানটি।
প্রথম নির্মিত শহিদমিনারটি এভাবে ভেঙ্গে ফেললেও পাকিস্তানি শাসকরা শহীদের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারেনি। সারা দেশে, বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনগুলিতে অনুরূপ ছোট ছোট অসংখ্য শহিদমিনার গড়ে ওঠে এবং ১৯৫৩ সাল থেকে দেশের ছাত্র-যুবসমাজ একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটিকে ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালন করতে থাকে। মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহিদমিনারের শূন্য স্থানটিতে লাল কাগজে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের অবিকল প্রতিকৃতি স্থাপন করে তা কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। সেই প্রতীকী শহিদমিনার থেকেই সে বছর ছাত্রদের প্রথম প্রভাতফেরি শুরু হয়। পরের বছরও ছাত্ররা একইভাবে শহিদ দিবস পালন করেন।
স্বাধীনতার পর থেকেই প্রবাসীদের উদ্যোগে বিদেশের মাটিতে শহিদমিনার নির্মাণ শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেলে শহিদমিনার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার প্রতীকস্বরূপ হয়ে ওঠে। বহির্বিশ্বে ১৯৯৭ সালে প্রথম যুক্তরাজ্যের এডিনবার্গের ওল্ডহ্যামে এবং ১৯৯৯ সালে লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে শহিদমিনার নির্মিত হয়। তাছাড়া গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০০৫ সালে জাপানের টোকিওতে শহিদমিনার নির্মিত হয়। জাপান-বাংলাদেশ সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর বৈশাখি মেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার সূত্র ধরে বাংলাদেশ সরকার এই শহিদমিনারটি নির্মাণ করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইতালীসহ বেশ কয়েকটি দেশে শহিদমিনার নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।

কক্সবাজারে শহিদমিনার
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে একুশের ভাষা শহিদদের ফুল দিয়ে সম্মান জানানোর সংস্কৃতি। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ যতদিন পর্যন্ত থাকবে ততদিন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে।
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানী ঢাকাতে একুশের ভাষা শহিদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর সংস্কৃতি চালু হলেও প্রান্তিক জেলা কক্সবাজারে তা শুরু হয়েছে দীর্ঘ কয়েক বছর পরে।
১৯৫৯-৬০ সালের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা দিবস পালন করা হতো। এ সময়ে রামু থেকে ছাত্র প্রভাতফেরি করতে ট্রাকযোগে মহকুমা সদরে আসতেন। তবে ১৯৬১ সালেই সর্বপ্রথম রামুতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভাষা দিবস পালিত হয়। মহকুমা সদর এবং রামু থানা সদর ছাড়া অন্য কোনো স্থানে এ সময়ে ভাষা দিবস উদযাপনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার আগপর্যন্ত কক্সবাজার মহকুমায় কোনো শহিদমিনার নির্মাণ হয়নি। শাসকগোষ্ঠীর গোয়েন্দাদের নীরব নির্যাতনের কারণে তা স্থাপন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে প্রতিবছর মহকুমা সদরে বিভিন্ন স্থানে অনাড়ম্বরভাবে ভাষা দিবস উদযাপন করা হতো। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট মাঠে ভাষা দিবস পালিত হয়। মৌলভী ফরিদ আহমদ, কামাল হোসেন চৌধুরী, নজরুল ইসলাম চৌধুরীসহ আরো কয়েকজন ছাত্রনেতা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। মূলত স্বাধীনতার পরে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে নির্মিত শহিদমিনারটি মহকুমার সর্বপ্রথম শহিদমিনার স্বীকৃত।
তবে এখন তার অস্তিত্ব নেই। ১৯৬৯ সালের দিকে কমরেড ইদ্রিস আহমদ, সুভাষ দাশ, সিরাজুল মোস্তফা প্রমুখ ছাত্র ইউনিয়ন নেতাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পালের দোকানস্থ শহিদমিনার। যেটি এখন পুরাতন শহিদমিনার নামে পরিচিত। এ শহিদমিনারটি কক্সবাজার পৌর মেয়র ১৮ জুন ২০০৬ সালে নতুনভাবে সংস্কার করেন। এ শহিদমিনারে ছাত্র ইউনিয়ন নেতারা প্রথম একুশের পালন করে করে বলে জানিয়েছেন কমরেড ইদ্রিস আহমদ।
তবে কেন্দ্রীয়ভাবে শহিদ দিবস পালনের জন্য কোনো চেষ্টাও পরিলক্ষিত হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধে কক্সবাজারের বহু মানুষ শহিদ হয়েছেন। তাদের জন্য কোনো স্মৃতি ফলক বা স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়নি। স্বাধীনতা যুদ্ধে কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বশির আহমদ ও মাস্টার শাহ আলম নামে ২ জন শিক্ষক শহিদ হওয়ায় মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ ছাত্রদের চৈতন্যের মধ্যে আশায় তারা উদ্যোগী হন।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি আমরা শহিদমিনার নির্মাণের জন্য জায়গা এবং অনুমতি প্রদানের জন্য তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদের অনুরোধ করে মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে। প্রথমে সরকারি অনুমতি ছাড়া শহিদমিনার নির্মাণের অনুমতি প্রদানে আবদুল কাদের অপারগতা প্রকাশ করায় ছাত্রনেতা কামাল হোসেন চৌধুরী প্রমুখকে দিয়ে অনুমতি প্রদানে রাজি করানো হয়।
১৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদেরের সভাপতিত্বে শিক্ষক পরিষদ এবং পরবর্তীতে ছাত্রদের নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কক্সবাজার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বকারী ছাত্র এবং প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদেরকে প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে ১৪ সদস্য বিশিষ্ট একটি ‘শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন―মাস্টার আবদুল রাজ্জাক, বদরুল আলম, সৈয়দ আহমদ, সুগত বড়–য়া, দ্বীননাথ রায়। ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন―মো. আলী, আলতাফ হোসেন, মুজিবুর রহমান, আবদুল কাদের, কবির আহমদ, সমীর পাল, খোরশেদ আলম, বিপুল সেন ও বিশ্বজিত সেন বাঞ্চু। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সামাদকে দিয়ে জাতীয় শহিদমিনারের আদলে একটি শহিদমিনার এবং স্মৃতিস্তম্ভের ২টি নকশা তৈরি করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভ দুটি হল স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত বিদ্যালয়ের শিক্ষক শহিদ শাহ আলম ও শহিদ বশির আহমদের জন্য। তারা দু’জনই ঢাকায় বি.এড প্রশিক্ষণরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহিদ হন। তাদের স্মৃতিস্বরূপ কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মিলনায়তনের নাম ‘শহীদ শাহ আলম-বশির আহমদ মিলনায়তন’ নামকরণ করা হয়। অপর স্মৃতিস্তম্ভটি হল স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত অত্র বিদ্যালয়ের ছাত্রদের জন্য। ছাত্রদের মধ্যে স্বপন ভট্টাচার্য, সুভাষ দাশ, শিশির বড়–য়া স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হন। প্রস্তুতকৃত শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভের নকশা অনুযায়ী ঘোনারপাড়া নবী হোসেন মিস্ত্রিকে দিয়ে প্রধান শিক্ষক আবদুল কাদের এবং কামাল হোসেন চৌধুরীসহ অন্যান্যের দ্বারা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে স্কুলের পশ্চিম গেইটের পার্শ্বে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। শিক্ষক ও ছাত্র সবার কাছ থেকে চাঁদা তুলে এবং স্টেডিয়াম কমিটির কাছ থেকে কিছু পরিত্যক্ত ইট সংগ্রহ করে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়। তৎকালীন জাতীয় পরিষদ সদস্য এডভোকেট নুর আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা এ.কে.এম মোজাম্মেল হক, ছাত্রলীগ নেতা নজরুল ইসলাম চৌধুরী, কামাল হোসেন চৌধুরী, দিদারুল আলম, হাবিবুর রহমান কক্সবাজারে প্রথম শহিদমিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ২১ শে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপনকালে মহকুমা প্রশাসক মোহাম্মদ ওমর ফারুক, জাতীয় পরিষদ সদস্য এডভোকেট নূর আহমদ এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের উপস্থিতিতে শহীদ মিনার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়। একই দিনে শহিদ মাস্টার শাহ আলমের বৃদ্ধ পিতা একই স্থানে শিক্ষক-ছাত্রদের জন্য নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের শুভ উদ্বোধন করেন। উল্লেখ্য যে, স্বাধীনতাত্তোর কক্সবাজারে এটিই ভাষা শহিদদের জন্য নির্মিত প্রথম স্থায়ী শহিদ মিনার, এ এলাকায় স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত শহিদদের স্মরণে প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ এবং শহিদদের স্মৃতিস্বরূপ তাদের নামে প্রথম কোনো স্থাপনার নামকরণ। ৩০
উদ্বোধনের পর কক্সবাজারের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠন, বিদ্যালয়, কলেজ, পুলিশ বাহিনী, পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহিদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদমিনার নির্মাণ না হওয়ায় পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শহিদমিনার কেন্দ্রীয় শহিদমিনার হিসাবে পরিগণিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে শহিদ সরণিস্থ শহিদমিনারটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পরিণত হয়েছে। মাঝে বেশ কিছু দিন শহিদমিনারটি কক্সবাজার পৌরসভার অধীনে থাকলেও বর্তমানে কক্সবাজার জেলা পরিষদের তত্বাবধানে কক্সবাজার কেন্দ্রীয় শহিদমিনার পরিচালিত হচ্ছে।
টেকনাফে স্বাধীনতার পরই নির্মিত হয় শহিদমিনার। এ ছাড়া উখিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালীতে আলাদা ব্কেন্দ্রীয় শহিদমিনার এবং জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহিদমিনার নির্মাণ করা হয়েছে।

দোহাই
১. মুস্তফা নুরউল ইসলাম, ‘সাময়িকপত্রে জীবন ও জনমত’, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৮৩, পৃ: ৩১৩।
২. সত্যেন সেন, ‘বৃটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা’, ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশনালয় এর তৃতীয় প্রকাশ-মার্চ ২০১১, পৃ : ৫৩
৩. প্রভাত মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্র বর্ষপঞ্জী, কলকাতা, ১৯৬৮, পৃ: ৭৮।
৪. অধ্যাপক আবদুর গফুর, বাংলা ভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠাতায় মুসলমান, শেখ তোফাজ্জ্বল হোসেন সম্পাদিত ‘বাংলা ভাষায় মুসলমানদের অবদান’, ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, অক্টোবর ২০০৩, পৃ: ৯১-৯২।
৫. ড. আসকার ইবনে শাইখ, বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম, অধ্যাপক কাযী আযিযউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম স্মারকগ্রন্থ’, সেপ্টেম্বর ১৯৯১, চট্টগ্রাম: প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম গণস্মরণ সভা কমিটি, পৃষ্ঠার নম্বর উল্লেখ নাই।
৬. এম এ বার্ণিক, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস- ঘটনাবহ ও প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ’, ঢাকা: এ এইচ ডেভেলপমেন্ট পাবলিশিং হাউস, জানুয়ারি ২০০৫, পৃ: ২৭
৭. ড. রংগলাল সেন, ‘বাংলাদেশ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, ফেব্রুয়ারি ২০০৩, ঢাকা: শিখা প্রকাশনী, পৃ: ১৭০-১৮০।
৮. বদরুদ্দীন উমর, ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীত’, ১ম খ-, ২য় সংস্করণ: পৃ:৩৫/ মোরশেদ শফিউল হাসান, ‘পূর্ব বাংলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০ দ্বন্দ¦ ও প্রতিক্রিয়া’, ২০০৭, ঢাকা: অনুপম প্রকাশনী, পৃ: ৯৭/ ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী, ‘পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন (১৯৪৭-১৯৭১)’, ঢাকা : জ্ঞান বিতরণী, মার্চ ২০০২ পৃ: ২৯১।
৯. বশীর আল হেলাল, ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, পৃ: ১৮৯-৯১।/মোস্তফা কামাল, ‘ভাষা আন্দোলন: সাতচল্লিশ থেকে বায়ান্ন’, দ্বিতীয় প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লি. পৃ: ১৪।
১০. শহীদুল ইসলাম, ‘একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়’, ঢাকা: বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলাপমেন্ট রিসার্চ বিশ্বসাহিত্য ভবন, বইমেলা ২০১৩, পৃ: ৬০।
১১. আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস, সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশ’, ঢাকা: তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২, পৃ: ২৭।
১২. বদরুদ্দীন উমর,‘আমাদের ভাষার লড়াই’’, টাপুর টুপুর গ্রন্থমালা-১, দ্বিতীয় প্রকাশ-মাঘ ১৩৯৫, চট্টগ্রাম: শিশু সাহিত্য বিতান, পৃ: ৩১-৩২।
১৩. মোহাম্মদ খালেদ সম্পাদিত, ‘হাজার বছরের চট্টগ্রাম’, মার্চ ১৯৯৫, দৈনিক আজাদীর ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশেষ সংখ্যা, পৃ: ৪০।/ শরীফ শমশির, ‘চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন’, আগস্ট ২০০৩, ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, পৃ: ২০।
১৪. শহীদুল ইসলাম, ‘একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়’, ঢাকা: বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলাপমেন্ট রিসার্চ বিশ্বসাহিত্য ভবন, বইমেলা ২০১৩, পৃ:৬৯।
১৫. বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কক্সবাজার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১১, দৈনিক ইনানী।
১৬. সূত্র: সৈনিক, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, উদ্বৃতি: নুরুল ইসলাম, ‘সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে’ ঢাকা: বাংলা একাডেমী, জুন ১৯৯০, পৃ: ১।
১৭. শহিদুল ইসলাম, ‘একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়’, ঢাকা: বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ, বইমেলা ২০১৩, পৃ: ৮৮/ বদরুদ্দীন উমর, ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালিন রাজনীত’, ৩য় খ-, চট্টগ্রাম: বইঘর, ১৯৮৫, পৃ: ২৫২-২৫৩।
১৮. বিস্তারিত দেখুন- আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক ; ‘ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য’, ঢাকা : জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ১৯৯১, পৃ: ৮৮-৯০।
19. Rangalal Sen, ÔPolitical Elites In BangladeshÕ, UPL-Dhaka, 1986, pp: 116
২০. শরীফ শমশির, ‘চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন’, আগস্ট ২০০৩, ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, পৃ: ৫২।
২১. বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে কক্সবাজার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১১, দৈনিক ইনানী।
২২. নুরুল হুদা চৌধুরী, ভাষাসংগ্রামী, বদরমোকাস্থ তার বাসায়। /এম এ বার্ণিক, ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস- ঘটনাবহ ও প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ’, ঢাকা: এ এইচ ডেভেলপমেন্ট পাবলিশিং হাউস, জানুয়ারি ২০০৫, পৃ:২৪৮।
২৩. বদিউল আলম, কক্সবাজারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বিকাশ, সাগর তীরে, ১৫ জুলাই ২০০৭, রামু: রম্য প্রকাশন, পৃ: ১৭-১৮।
২৪. সাক্ষাৎকার, ডা. জামাল উদ্দিন আহমদ, ভাষাসংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, জাসদ নেতা, ১৩ জানুয়ারি ২০১৪, কক্সবাজার শহরের চৌধুরী কুটিরস্থ মুহম্মদ নুরুল ইসলামের বাসায়।
২৫. ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার, এম এ শুকুর, পেকুয়া জিএমসি ইনস্টিটিউটের ৮ম শ্রেণির ছাত্র, (১৯৫২), পরবর্তীতে টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও উখিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব (১৯৭১), ২৫ অক্টোবর ২০১৩, টেকনাফ অলিয়াবাদস্থ বাসায়।
২৬. ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকার, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, কুতুবদিয়া বড়ঘোপ হাই স্কুলের তৎকালিন ৯ম শ্রেণির ছাত্র, সম্পাদক―দৈনিক কক্সবাজার এবং সহসভাপতি, কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ, ২৫ জানুয়ারি ২০১৪, কক্সবাজার শহরের উত্তর রুমালিয়ারছড়াস্থ বাসায়।
২৭. ব্যক্তিগত সাক্ষাতকার, প্রফেসর মোশতাক আহমদ, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১০, রামু, কক্সবাজার।
২৮. বাদশা মিয়া চৌধুরী, ব্যক্তিগত সাক্ষাতকার-২৩ ডিসেম্বর ২০১৪, হলদিয়া পালং, উখিয়া কক্সবাজার।
২৯. আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন সম্পাদিত, ‘ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিাহস, জুন ২০০০, বাংলা একাডেমী, ঢাকা: ১০৩।
৩০. এম এম সিরাজুল ইসলাম, কক্সবাজারের প্রথম শহিদমিনার ও স্মৃতিস্মম্ভ, বিজয় স্মারক ২০১৪, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪, পৃ: ১৯৭-৯৮।